
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্বজুড়ে তীব্র ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও আধুনিকায়নের প্রতিযোগিতার জেরে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে খরচের সব রেকর্ড ভেঙে গেছে। গত এক বছরে বিশ্বের ৯টি পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ তাদের পরমাণু কর্মসূচিতে সম্মিলিতভাবে রেকর্ড ১১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে। আন্তর্জাতিক প্রচারণা সংস্থা ‘আইক্যান’ (ICAN)-এর সর্বশেষ রিপোর্টে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের বছরের তুলনায় এই ব্যয় প্রায় ১৯% বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ, পরমাণু শক্তিধর দেশগুলো প্রতি সেকেন্ডে গড়ে প্রায় ৩,৭৬৮ ডলার খরচ করেছে শুধু তাদের পারমাণবিক অস্ত্রাগার সচল ও আধুনিক করতে।
কোন দেশ কত খরচ করেছে? (প্রধান দেশগুলোর তালিকা)
১. যুক্তরাষ্ট্র: ৬৯.২ বিলিয়ন ডলার (অন্য সব দেশের সম্মিলিত খরচের চেয়েও বেশি। এক বছরে ব্যয় বেড়েছে ২২%)
২. চীন: ১৩.৫ বিলিয়ন ডলার (৭% ব্যয় বৃদ্ধি করে তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে)
৩. যুক্তরাজ্য: ১২.৬ বিলিয়ন ডলার (রাশিয়াকে টপকে এবার তৃতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়কারী দেশ হয়েছে)
৪. রাশিয়া: ৯.৫ বিলিয়ন ডলার (ইউক্রেন যুদ্ধ সত্ত্বেও পারমাণবিক আধুনিকায়নে ব্যয় ৬% বাড়িয়েছে)
৫. ফ্রান্স: ৭.৭ বিলিয়ন ডলার
৬. ভারত: ২.৮ বিলিয়ন ডলার
৭. ইসরায়েল: ১.১ বিলিয়ন ডলার
৮. পাকিস্তান: ১.০ বিলিয়ন ডলার
৯. উত্তর কোরিয়া: ৬৫৬ মিলিয়ন ডলার
খরচের এই উল্লম্ফনের কারণ কী?
আইক্যানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূলত তিনটি কারণে এই খরচ রেকর্ড ছুঁয়েছে:
আধুনিকীকরণ প্রকল্প: পুরনো পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র, সাবমেরিন এবং ওয়ারহেডগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে আরও উন্নত করা হচ্ছে।
ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা: মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং ইউরোপে চলমান যুদ্ধের কারণে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে পারমাণবিক সক্ষমতা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা বেড়েছে।
দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি: যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সের মতো দেশগুলো আগামী শতাব্দীর কথা মাথায় রেখে প্রতিরক্ষা খাতের বড় বড় কোম্পানির সাথে বিলিয়ন ডলারের দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করছে।
তীব্র সমালোচনা ও উদ্বেগ
আইক্যান (ICAN) এবং স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউট (SIPRI) এই চরম অপচয়ের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। আইক্যানের পলিসি প্রধান অ্যালিসিয়া স্যান্ডার্স-জাক্রে বলেন:
”যখন বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী, জলবায়ু পরিবর্তনের তহবিল সংকুচিত করা হচ্ছে এবং জাতিসংঘ অর্থ সংকটে ভুগছে—তখন ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের পেছনে এই পরিমাণ অর্থ অপচয় অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের এক বছরের পারমাণবিক বাজেট দিয়ে জাতিসংঘের পুরো বার্ষিক বাজেট ১৯ বার চালানো সম্ভব।”
বর্তমানে সারাবিশ্বে প্রায় ১২,০০০-এরও বেশি সক্রিয় পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে, যার সিংহভাগই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই লাগামহীন ব্যয় বিশ্বকে একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং বিপজ্জনক পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।