সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১০:২৯ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম ::
যৌতুক মামলার আসামি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও গ্রেপ্তার করছে না পুলিশ, অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারের জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ‘পাতলী খাল’ পুনঃখনন উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী প্যারাগুয়ের জালে ৪ গোল, বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়ল যুক্তরাষ্ট্র এক মঞ্চে বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও গণসংহতি আন্দোলন বন্দরে স্টার্টআপ, সায়েন্স প্রজেক্ট ও ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত সিদ্ধিরগঞ্জে ৪০ পিস ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার মহানবী কেন ‘মাদায়েনে সালেহ’ দেখতে নিষেধ করেছেন? বাংলাদেশ রিপোর্টার্স ক্লাব ট্রাস্ট নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সভা অনুষ্ঠিত রেকর্ড ব্যয়: পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে বিশ্বজুড়ে খরচ ১১৯ বিলিয়ন ডলার, শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র বইমেলা ২০২৬-এ প্রকাশিত হয়েছে মোঃ মামুন হোসেনের প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ “জীবনের বর্ণিল ক্যানভাস”

মহানবী কেন ‘মাদায়েনে সালেহ’ দেখতে নিষেধ করেছেন?

  • আপডেট সময় শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ১২.১৭ পিএম
  • ১ বার পড়া হয়েছে

​​বর্তমান সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের চোখধাঁধানো উপত্যকা ‘আল-উলা’ বা ‘মাদায়েনে সালেহ’ আজ বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। পাহাড় কেটে তৈরি করা হাজার বছরের প্রাচীন পাথুরে স্থাপত্য আর বিলাসবহুল রিসোর্ট দেখতে প্রতিদিন সেখানে ভিড় করছেন লাখো মানুষ।

​কিন্তু একজন সাধারণ পর্যটকের চোখে এটি কেবলই এক প্রাচীন সভ্যতার নান্দনিক নিদর্শন হলেও, ইসলামি ইতিহাসে এই স্থানের তাৎপর্য অত্যন্ত ভয়াবহ। ইসলামি ঐতিহ্য অনুযায়ী, এই অঞ্চলটিই হলো ইতিহাসের অভিশপ্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত ‘সামুদ’ জাতির বাসস্থান।

​পার্থিব উন্নতি ও প্রযুক্তিতে অনন্য এই জাতি যখন আল্লাহর অবাধ্যতা এবং অহংকারে লিপ্ত হয়েছিল, তখন এক প্রলয়ংকরী আজাব দিয়ে তাদের চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়। আজাবের এই স্থানটিতে আনন্দ-বিনোদনের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ বা অবস্থান করার ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে ইসলামে।

​প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এখানকার বিশাল পাহাড় কেটে তৈরি করা চোখধাঁধানো কারুকার্য ও স্থাপত্যশৈলী আধুনিক যুগের মানুষকেও রীতিমতো অবাক করে দেয়। তবে একজন মুমিনের কাছে এবং ইসলামি ইতিহাসে এই স্থানের তাৎপর্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অত্যন্ত ভয়াবহ। মানব ইতিহাসের এক চরম অহংকারী ও অবাধ্য জাতিকে আল্লাহ তাআলা যেখানে তাঁর কঠিন আজাব দিয়ে চিরতরে মিটিয়ে দিয়েছিলেন, সেই স্থানটি আজ পর্যটকদের আনন্দ-বিনোদনের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে—যে স্থানে আল্লাহর গজব নাজিল হয়েছিল, সেখানে কি একজন মুসলমানের জন্য বিনোদনমূলক ভ্রমণে যাওয়া কিংবা সময় কাটানো উচিত?

​সামুদ জাতির উত্থান ও অবাধ্যতা
​ইতিহাসের পাতায় সামুদ জাতি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী, দীর্ঘকায় এবং প্রযুক্তিতে অগ্রসর এক জাতি। আল্লাহ তাআলা তাদের বিপুল ধন-সম্পদ, উর্বর ভূমি, চোখ জুড়ানো বাগান ও ঝরনাধারা দান করেছিলেন। পাহাড় কেটে সুউচ্চ ও মজবুত প্রাসাদ এবং পাথরের বুক চিরে চমৎকার সব বাসস্থান তৈরিতে তারা ছিল অদ্বিতীয়। স্থাপত্যশিল্পে তাদের এই অভূতপূর্ব দক্ষতা আজ থেকে হাজার হাজার বছর পার হওয়ার পরও আল-উলার পাহাড়ি গুহা ও ঘরগুলোতে স্পষ্ট দেখা যায়।

​কিন্তু এই পার্থিব উন্নতি ও প্রাচুর্য সামুদ জাতির মধ্যে চরম অহংকার ও ঔদ্ধত্যের জন্ম দেয়। তারা আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের কথা ভুলে গিয়ে মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয় এবং সমাজের দুর্বল ও গরিব মানুষের ওপর নির্মম অত্যাচার শুরু করে। এই ক্রান্তিলগ্নে আল্লাহ তাআলা তাদের হেদায়েতের জন্য তাদেরই মধ্য থেকে সালেহ (আ.) নামের এক নবীকে প্রেরণ করেন।

​পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,

​“আর সামুদ জাতির প্রতি আমি তাদের ভাই সালেহকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, ‘হে আমার কওম, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ নেই।’” (সুরা হুদ, আয়াত: ৬১)

​সালেহ (আ.) তাদের অহংকার ত্যাগ করে এক আল্লাহর প্রতি ইমান আনার এবং মানুষের ওপর জুলুম বন্ধ করার আহ্বান জানান। কিন্তু সামুদ জাতির প্রভাবশালী ও ধনী নেতারা তাঁর এই আহ্বানকে উপহাস করে উড়িয়ে দেয়।

​অলৌকিক উষ্ট্রী ও আল্লাহর গজব
​সামুদ জাতি নবীর কাছে একটি কঠিন ও অলৌকিক মোজেজা দাবি করে বসে। তারা বলে, তিনি যদি সত্যিই আল্লাহর নবী হয়ে থাকেন, তবে যেন সামনের ওই বিশাল শক্ত পাথরখণ্ড থেকে একটি জীবন্ত, গর্ভবর্তী এবং বিশালাকৃতির শে-উট বা উষ্ট্রী বের করে দেখান। নবী সালেহ আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় সেই পাথর ফেটে এক বিশাল অলৌকিক উষ্ট্রী বের হয়ে আসে এবং সেটি একটি বাচ্চার জন্ম দেয়।

​এই অলৌকিক নিদর্শন দেখার পর কিছু মানুষ ইমান আনলেও, অধিকাংশ লোক তাদের কুফর ও অহংকারে অবিচল থাকে। আল্লাহর নির্দেশে তাঁর জাতিকে সতর্ক করে দিয়ে নবী সালেহ বললেন, এই উষ্ট্রী আল্লাহর একটি বিশেষ পরীক্ষা। উপত্যকার পানি পানের জন্য এই উটের জন্য একদিন এবং পুরো জাতির জন্য একদিন নির্ধারিত থাকবে। কেউ যেন এই উটের কোনো ক্ষতি না করে, অন্যথায় আল্লাহর দ্রুত ও কঠিন আজাব তাদের গ্রাস করবে।

​কিন্তু অবাধ্য সামুদ জাতি অত্যন্ত ধৃষ্টতা দেখিয়ে আল্লাহর সেই পবিত্র উটটিকে হত্যা করে এবং তার বাচ্চাকে তাড়িয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, তারা নবীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলল, পারলে তোমার আল্লাহর আজাব নিয়ে এসো। তাদের এই চূড়ান্ত সীমালঙ্ঘনের পর আল্লাহর ফয়সালা চলে আসে।

​তিন দিন সময় দেওয়ার পর, গভীর রাতে এক ভয়াবহ ও বিকট শব্দ এবং প্রচণ্ড ভূমিকম্প এসে পুরো সামুদ জাতিকে স্তব্ধ করে দেয়। পবিত্র কোরআনে সেই ভয়াবহ শাস্তির বিবরণ দিয়ে বলা হয়েছে,

​“অতঃপর এক তীব্র ভূমিকম্প তাদেরকে পাকড়াও করল, ফলে তারা নিজেদের ঘরে উপুড় হয়ে মরে রইল।” (সুরা আরাফ, আয়াত: ৭৮)

​সেই শক্তিশালী ও দাম্ভিক সভ্যতার একজন মানুষও সেদিন বেঁচে থাকতে পারেনি। অলৌকিক ও সুউচ্চ যেসব পাথুরে প্রাসাদ নিয়ে তাদের অহংকারের শেষ ছিল না, সেগুলোই আজ ফাঁকা পড়ে থেকে মানবজাতির জন্য আল্লাহর বিচার ও ক্ষমতার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

​মাদায়েনে সালেহ নিয়ে নবীজির নির্দেশনা
​ঐতিহাসিক নবম হিজরিতে মুসলিম বাহিনী যখন মহানবী (সা.)-এর নেতৃত্বে রোমানদের বিরুদ্ধে ‘তাবুক যুদ্ধের’ উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল, তখন যাত্রাপথে তারা এই আল-হিজর বা আল-উলা (মাদায়েনে সালেহ) অঞ্চলটি অতিক্রম করেন। ওই মরুভূমির দীর্ঘ সফরে সাহাবিরা ক্লান্ত ছিলেন এবং পানির প্রয়োজনে তারা সামুদ জাতির ফেলে যাওয়া কুয়া থেকে পানি সংগ্রহ করেন এবং সেই পানি দিয়ে রুটি তৈরির জন্য আটা খামির করেন।

​যখন আল্লাহর রাসুল (সা.) জানতে পারলেন যে এটি সেই অভিশপ্ত সামুদ জাতির এলাকা, তখন তিনি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ও সতর্ক হয়ে উঠলেন। তিনি সাহাবিদের নির্দেশ দিলেন যেন সেই কুয়ার পানি সব ফেলে দেওয়া হয় এবং সেই পানি দিয়ে মাখানো আটা যেন উটকে খাইয়ে দেওয়া হয়। তিনি কেবল একটিমাত্র কুয়ার পানি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিলেন—যে কুয়াটি থেকে নবী সালেহের সেই অলৌকিক উষ্ট্রী পানি পান করত।

​সাহাবিদের সেই এলাকা দ্রুততার সঙ্গে অতিক্রম করার আদেশ দেন নবীজি (সা.) এবং সেখানে অবস্থান করতে বা আনন্দ প্রকাশ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেন। তিনি বলেন,

​“তোমরা এই আজাবপ্রাপ্ত সম্প্রদায়ের বাসস্থানে কান্না ছাড়া অন্য কোনো অবস্থায় প্রবেশ কোরো না। যদি তোমাদের কান্না না আসে, তবে সেখানে প্রবেশই কোরো না; যাতে তাদের ওপর যে আজাব এসেছিল, তা তোমাদের ওপরও এসে না পড়ে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৭০২)

​নবীজি নিজে যখন সেই উপত্যকা পার হচ্ছিলেন, তখন তিনি তাঁর চাদর দিয়ে নিজের পবিত্র মুখমণ্ডল ঢেকে নিয়েছিলেন এবং তাঁর সওয়ারিকে দ্রুত গতিতে চালিয়ে সেই এলাকা পার হয়েছিলেন। (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি শারহ সহিহ আল-বুখারি, ৬/৩৮০, দারুল মাআরিফা, বৈরুত, ১৩৭৯ হিজরি)

​আধুনিক গবেষকদের সতর্কতা
​সৌদি আরবের প্রধান মুফতি এবং শীর্ষস্থানীয় আলেম শেখ সালেহ আল-ফাওজানসহ সমসাময়িক বহু ইসলামি স্কলার এই বিষয়ে ইসলামের প্রাচীন নীতি পুনরুল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, ইসলামে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বা ইতিহাস জানার উদ্দেশ্যে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতির এলাকা পরিদর্শনের অনুমতি কেবল তখনই দেওয়া হয়েছে, যখন তার উদ্দেশ্য হবে ‘ইবরাত’ বা শিক্ষা গ্রহণ এবং আল্লাহর আজাব থেকে মুক্তি চাওয়া।

​আধুনিক পরিবেশ ও ভূ-তাত্ত্বিক গবেষকরাও আল-উলা বা মাদায়েনে সালেহ অঞ্চলে দীর্ঘসময় অবস্থান করার ক্ষেত্রে কিছু প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত ঝুঁких কথা উল্লেখ করেছেন। এই শুষ্ক এবং প্রাচীন উপত্যকায় দীর্ঘকাল ধরে ভূগর্ভস্থ গ্যাস বা বিশেষ পরিবেশগত প্রভাব থাকতে পারে, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।

​সূত্র: দি ইসলামিক ইনফরমেশন ডট কম

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2021 rudrabarta24.net
Theme Developed BY ThemesBazar.Com

sakarya bayan escort escort adapazarı Eskişehir escort