
আসাদুজ্জামান
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটভূমিতে ক্ষমতার হাতবদল হলেও, শাসনব্যবস্থার অভ্যন্তরে বিদ্যমান কিছু অদৃশ্য জটিলতা এবং ভবিষ্যৎ সংস্কারের রূপরেখা নিয়ে সম্প্রতি একটি গভীর ও বিশ্লেষণমূলক আলোচনা সামনে এসেছে। দৃশ্যমান ক্ষমতার বাইরেও যে একটি সুনির্দিষ্ট শাসনকাঠামো বা ‘সিস্টেম’ পুরো রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করছে—এই আলোচনায় তার একটি নির্মোহ চিত্র ফুটে উঠেছে। ফলে, ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেও ব্যবস্থার পুরোনো রূপ এবং পর্দার আড়ালের চালিকাশক্তিগুলো যেন বারবার ফিরে আসছে, যা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে নানামুখী প্রশ্ন তুলছে।
আমাদের দেশের ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দু শুধু দৃশ্যমান সরকার বা রাজনৈতিক দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পর্দার আড়ালে এমন একটি ‘অদৃশ্য রাষ্ট্রযন্ত্র’ বা ডিপ স্টেট কাজ করে, যারা মূলত দেশের নীতি ও ভাগ্য নির্ধারণ করে। এই শক্তির মূল নিয়ন্ত্রণ বা রিমোট কন্ট্রোল থাকে সীমান্তের ওপারে। তারা এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করে রেখেছে, যেখানে দেশের সাধারণ মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার চেয়ে বাইরের স্বার্থ বেশি প্রাধান্য পায়।
জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসায় মানুষের মনে বড় ধরনের পরিবর্তনের আশা জেগেছিল। কিন্তু এই অদৃশ্য শক্তি একটি সুনির্দিষ্ট মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী কাজ করছে। তারা বাংলাদেশে একটি ‘লিমিটেড ডেমোক্রেসি’ বা নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র বজায় রাখতে চায়।
এর বড় প্রমাণ হলো, নতুন ব্যবস্থার অধীনেও নির্বাচনী মাঠে পুরোনো রাজনৈতিক রূপই ফিরে এসেছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৮৫ জন পুরোনো সংসদ সদস্য (এমপি) এবং সুপরিচিত পুরোনো মুখগুলোই নতুন কোনো রাজনৈতিক ব্যানারে বা ভিন্ন পোশাকে আবার ক্ষমতায় আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অর্থাৎ, চেহারার বদল হলেও মূল ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।
এই অদৃশ্য সিস্টেম কীভাবে তার বিরোধিতাকারীদের দমন বা নিয়ন্ত্রণ করে, তা বোঝাতে হাদি ও হাসনাত নামের দুজন ব্যক্তির উদাহরণ দেওয়া যায়:
যদি আমরা সত্যিই এই চক্র থেকে বের হতে চাই, তবে শুধু নেতা বা দল পরিবর্তন করে লাভ নেই। শাসনব্যবস্থার দুটি জায়গায় মৌলিক সংস্কার করা জরুরি।
বর্তমানে একজন এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর তার এলাকার স্কুল, কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা, রাস্তাঘাট এবং সব ধরনের উন্নয়নমূলক কমিটির প্রধান হয়ে বসেন। এর ফলে স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান বা পৌর মেয়রের সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তৈরি হয় এবং এমপিরা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন।
প্রস্তাবিত সংস্কার: এমপিদের কাজ হবে শুধু জাতীয় সংসদে বসে দেশের জন্য আইন ও নীতি তৈরি করা। স্থানীয় কোনো উন্নয়ন বা প্রশাসনিক দায়িত্বে তাদের কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না। স্থানীয় উন্নয়নের দায়িত্ব থাকবে সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় সরকারের (চেয়ারম্যান/মেয়র) হাতে।
বর্তমানে আমাদের দেশে নির্বাচন একটি ‘হাই-প্রোফাইল ইনভেস্টমেন্ট প্রজেক্ট’ বা বড় ব্যবসায়িক বিনিয়োগে পরিণত হয়েছে। একজন প্রার্থী কোটি কোটি টাকা খরচ করে নির্বাচন করেন এবং ক্ষমতায় গিয়ে সেই টাকা তোলার জন্য দুর্নীতিতে জড়ান। ফলে সৎ ও যোগ্য মানুষরা কখনোই নির্বাচনে টিকে থাকতে পারেন না।
প্রস্তাবিত সংস্কার: নির্বাচনের এই বাণিজ্যিক রূপ পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। কোনো প্রার্থী ব্যক্তিগতভাবে পোস্টার ছাপানো, মাইকিং বা বিশাল জনসভা করতে পারবেন না।
বিকল্প পদ্ধতি: নির্বাচন কমিশন নিজ দায়িত্বে প্রতিটি প্রার্থীর জন্য সমমানের পোস্টার এবং প্রচারণার ব্যবস্থা করবে। এছাড়া, প্রতিটি আসনে প্রার্থীদের নিয়ে ‘সরাসরি বিতর্ক’ (লাইভ ডিবেট)-এর আয়োজন করা হবে, যেখানে প্রার্থীরা জনগণের সামনে তাদের পরিকল্পনা তুলে ধরবেন। জনগণ কোনো টাকা বা পেশিশক্তি না দেখে, শুধুমাত্র প্রার্থীর যোগ্যতা ও যুক্তি দেখে ভোট দেবেন।
এই মৌলিক সংস্কারগুলো না করা পর্যন্ত ক্ষমতার হাতবদল হবে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রকৃত মুক্তি বা ‘ডিপ স্টেট’-এর প্রভাব থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়। দেশের টেকসই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এই বিষয়গুলো নিয়ে এখনই ভাবার সময় এসেছে।