
মোঃ মামুন হোসেন : একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম, অন্যদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং—তার সঙ্গে কোথাও কোথাও চাঁদাবাজির অতিরিক্ত বোঝা। যেন সাধারণ মানুষের জীবনে একসঙ্গে নেমে এসেছে তিনটি সংকট। আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবার। বাজারে গেলেই মনে হচ্ছে, আগের সেই পরিচিত বাজার আর নেই; একই অর্থে আগের তুলনায় অনেক কম পণ্য কিনতে হচ্ছে। আর ঘরে ফিরেও স্বস্তি নেই—বিদ্যুৎ কখন আসবে, কখন যাবে, তার নিশ্চয়তা অনেক জায়গাতেই অনিশ্চিত।সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি যে কঠিন হয়ে উঠেছে, তার বাস্তব প্রভাব পড়ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে গ্রামাঞ্চলের কিছু এলাকায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিং এবং জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। গ্যাস সংকট বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বড় চাপ তৈরি করছে।লোডশেডিং শুধু ঘর অন্ধকার করে না; এটি মানুষের জীবনযাত্রার গতি কমিয়ে দেয়। শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ব্যাহত হয়, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, দোকান ও কারখানার উৎপাদন কমে যায়। গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষকে বাড়তি দুর্ভোগ পোহাতে হয়। সবচেয়ে বড় কথা, বিদ্যুৎ সংকট যখন দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন তার প্রভাব সরাসরি উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় গিয়ে পড়ে। ফলে শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচের বোঝা এসে পড়ে ভোক্তার কাঁধে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দ্রব্যমূল্যের চাপ। সাম্প্রতিক বাজারচিত্রে ডিম, মাংস, মাছসহ বেশ কিছু পণ্যের দাম বাড়ার খবর এসেছে। এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ব্রয়লার মুরগি, গরুর মাংস, ডিম ও ইলিশের দাম বেড়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতাকে সংকুচিত করছে। অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণেও মূল্যস্ফীতিকে দেশের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।দ্রব্যমূল্য বাড়লে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ। একজন শ্রমিকের দৈনিক আয় হয়তো একই থাকে, কিন্তু চাল, ডাল, তেল, ডিম, মাছ, সবজি, পরিবহন, বাসাভাড়া ও চিকিৎসার খরচ একের পর এক বাড়তে থাকে। তখন পরিবারকে প্রয়োজনের তালিকা ছোট করতে হয়। কেউ হয়তো মাছ-মাংস কমিয়ে দেন, কেউ সন্তানের পড়াশোনার অতিরিক্ত খরচ বন্ধ করেন, কেউ চিকিৎসা পিছিয়ে দেন। এভাবেই মূল্যস্ফীতি শুধু অর্থনীতির পরিসংখ্যান থাকে না; এটি মানুষের জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে যায়।এর মধ্যে চাঁদাবাজি যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়। পরিবহন, বাজার, দোকান, ফুটপাত কিংবা ব্যবসার বিভিন্ন স্তরে অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগ থাকলে সেই অর্থ শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীর পকেট থেকে গেলেও এর প্রভাব পড়ে পণ্যের দামে। কারণ ব্যবসায়ী তার বাড়তি ব্যয় কোনো না কোনোভাবে পণ্যের মূল্যের সঙ্গে যুক্ত করতে বাধ্য হন। ফলে একটি অবৈধ আদায়ের বোঝা ঘুরেফিরে ভোক্তার ওপরই চাপ সৃষ্টি করে। চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা যে বাজারদর ও আইনশৃঙ্খলা—দুই ক্ষেত্রেই ক্ষতিকর, সে বিষয়ে সরকারি পর্যায় থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।তবে সংকটের দায় শুধু ব্যবসায়ী বা সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। বাজারে মূল্যবৃদ্ধির পেছনে উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকট, পরিবহন ব্যয়, সরবরাহ ঘাটতি, আমদানি ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগী এবং অনিয়ম—সবগুলো কারণকে আলাদা করে দেখতে হবে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট ইতোমধ্যে শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থায় প্রভাব ফেলছে বলে ব্যবসায়ী মহল উদ্বেগ জানিয়েছে।এ অবস্থায় সরকারের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত সমস্যার বাস্তব চিত্র জনগণের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা এবং দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, উৎপাদন ও সঞ্চালন ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে বাজারে নিয়মিত ও কার্যকর তদারকি বাড়াতে হবে। শুধু অভিযান চালিয়ে সাময়িকভাবে দাম কমানো নয়—সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে হতে হবে দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা। চাঁদাবাজ যে পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাবের আড়ালেই থাকুক, আইনের আওতায় আনতে হবে। কোনো ব্যবসায়ীকে ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের সুযোগ থাকলে মুক্ত বাজার কখনোই কার্যকর হতে পারে না। একইভাবে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, মজুতদারি বা কারসাজির অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রমাণের ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জনগণের ধৈর্যেরও একটি সীমা আছে। মানুষ উন্নয়ন চায়, কিন্তু তার চেয়েও বেশি চায় স্বস্তি; সে বড় বড় প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি চায় ঘরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, বাজারে সহনীয় দাম এবং নিরাপদ পরিবেশে ব্যবসা ও জীবিকা নির্বাহের নিশ্চয়তা।একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি শুধু বড় প্রকল্প, প্রবৃদ্ধি বা পরিসংখ্যান নয়; সাধারণ মানুষ মাসের শেষে কতটা স্বস্তিতে সংসার চালাতে পারছে, সেটিও তার বড় সূচক। যে পরিবার বাজারের ব্যাগ ছোট করতে বাধ্য হচ্ছে, যে শিক্ষার্থী বিদ্যুতের অভাবে পড়তে পারছে না, যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অতিরিক্ত খরচে টিকে থাকার লড়াই করছে—তাদের বাস্তব জীবনকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে।আজ প্রয়োজন রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগ, সাময়িক সমাধানের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং দায় চাপানোর চেয়ে জবাবদিহি। লোডশেডিং কমাতে হবে, বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিতে হবে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় সমন্বিত অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করতে হবে।কারণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার জনগণ। সেই জনগণ যদি দ্রব্যমূল্যের চাপে ক্লান্ত, বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত এবং চাঁদাবাজির ভয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে, তবে অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হওয়াই স্বাভাবিক। তাই এখন সময় মানুষের কষ্টকে শুধু পরিসংখ্যান হিসেবে না দেখে মানবিক বাস্তবতা হিসেবে বিবেচনা করার।দ্রব্যমূল্যের আগুন নেভাতে হবে, লোডশেডিংয়ের অন্ধকার কাটাতে হবে, চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে—জনগণের স্বস্তিই হোক রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান অঙ্গীকার।