
মোঃ- শামছুল আলম তুহিনঃ সোনারগাঁয়ের সুমিষ্ট ও রসালো লিচু বাজারে আসতে শুরু করেছে। ভৌগলিক অবস্থান, আবহাওয়াগত বৈশিষ্ট্য ও নির্দিষ্ট জাতের কারণে সোনারগাঁয়ের লিচু সবচেয়ে আগে বাজারে আসে বলে এর আলাদা খ্যাতি রয়েছে।
সোনারগাঁয়ের লিচু আগাম বাজারে আসে বলে দেশের বিভিন্ন স্থানের লিচুর তুলনায় এ লিচুর চাহিদা থাকে বেশি। মিষ্টি ও সুস্বাদু হিসেবে সোনারগাঁয়ের লিচু সারা দেশে বেশ পরিচিতি লাভ করেছে। এমনকি বহির্বিশ্বেও এই সুমিষ্ট রসালো লিচুর বেশ কদর রয়েছে। বৈশাখের শেষ সময়ে এ লিচু প্রথম বাজারে আসে। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও চড়ামূল্যে বাগানীদের কাছ থেকে লিচু কিনেছে মৌসুমী লিচু ব্যবসায়ীরা। সোনারগাঁয়ের লিচুর কদর থাকায় বেশি লাভের আশায় বিক্রির জন্য বাজারে আনছেন ব্যবসায়ীরা।
জানা যায়, ঐতিহাসিক সোনারগাঁয়ে পর্তুগিজদের আগমনের পর অর্থাৎ ১৭০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে প্রথম লিচুর চাষ শুরু হয়। পর্তুগিজরাই সোনারগাঁয়ে প্রথম লিচু চাষ শুরু করেন। প্রথমে ছোট পরিসরে এর চাষ শুরু হলেও এখন তা ব্যাপকভাবে রূপ নিয়েছে। লিচু ব্যবসা লাভজনক হওয়ায় প্রতিনিয়ত জমির মালিকরা নতুন নতুন লিচুর গাছ রোপণ করছেন।
সোনারগাঁয়ে সাধারণত তিন প্রজাতির লিচুর ফলন হয়ে থাকে। এগুলো হলো- পাতি লিচু, কদমী লিচু ও বোম্বাই (চায়না-৩) লিচু। সোনারগাঁয়ে সর্বপ্রথম পাতি জাতের লিচু, পরে কদমী লিচু ও সর্বশেষ বোম্বাই জাতের লিচু পেকে থাকে।
সরেজমিনে সোনারগাঁয়ের বিভিন্ন লিচুর বাগান ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি বাগানের গাছে থোকায় থোকায় কাঁচা-পাকা লিচু ঝুলছে। গাছের ডালে ডালে ঝুলন্ত লাল টকটকে রঙের ছোট-বড় ফলের গুচ্ছ লিচুর দৃশ্য খুবই মনোরম। প্রতিটি গাছে বৈদ্যুতিক বাতি, টিনের বাজনা বাজিয়ে উচ্চশব্দ করে বাদুর ও কাকের উপদ্রব থেকে লিচুকে রক্ষা করতে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন লিচু চাষিরা। কাক, বাদুর ও চোরের উপদ্রব থেকে লিচু রক্ষা করতে নিজেরাই রাত জেগে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
এদিকে স্থানীয়রা জানান, সোনারগাঁয়ে কদমি, মোজাফফরপুরী, বোম্বাই (চায়না-৩), এলাচি ও পাতি এ পাঁচ ধরনের লিচুর চাষ হয়ে থাকে। তবে অন্যান্য লিচু থেকে বর্তমানে কদমি লিচু চাষের প্রতি মনোযোগী হয়ে পড়েছেন চাষিরা। তাই তারা কোথাও একটু খালি জায়গা পেলে সেখানেই লিচুর বাগান তৈরি করছেন। সোনারগাঁয়ে ছোট-বড় মিলিয়ে কয়েক শতাধিক লিচুর বাগান রয়েছে। এসব বাগানে বেশির ভাগই কদমি লিচু চাষ হচ্ছে।
মোগরাপাড়া চৌরাস্তা এলাকার লিচু বিক্রেতা মাসুদ রানা জানান, অন্যান্য অঞ্চলের লিচুর চাইতে সোনারগাঁয়ের লিচু আকারে একটু বড় ও সুস্বাদু হওয়ায় এ লিচুর চাহিদা বেশি রয়েছে। আর সোনারগাঁয়ের লিচু সবার আগে বাজারে আসে তাই এর চাহিদা ও দাম একটু বেশিই। তারপরও অনেকে তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য এমন সুমিষ্ট ও রসালো লিচু কিনে নিয়ে যান।
লিচু বিক্রেতা ইব্রাহিম জানান, সোনারগাঁয়ের লিচুর একটা আলাদা স্বাদ ও ঐতিহ্য রয়েছে। প্রকারভেদে দাম একটু বেশি হলেও এসব লিচুর স্বাদও খুবই সুমিষ্ট। দাম একটু বেশি হলেও আশেপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে অনেকেই আসেন সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্যবাহী এই সুমিষ্ট রসালো লিচু কিনে নিতে। কেউবা নিয়ে যান কাউকে না কাউকে উপহার হিসেবে দিতে।
অপর বিক্রেতা ফয়সাল আহমেদ জানান, আমাদের সোনারগাঁয়ের লিচুর একটা আলাদা ঐতিহ্য রয়েছে। বছরের শুরুতে সোনারগাঁয়ের লিচু বাজারে আসার কারনে এর স্বাদ নিতে আমাদেরও খুর আগ্রহ থাকে। তবে বিভিন্ন দূর-দূরান্ত থেকে অনেক লোকজন আমাদের মতো এমন আগ্রহ ও সুস্বাদুর কারনেই এই লিচু কিনে নিতে আসেন। আর প্রকারভেদে কদমি লিচুর দাম রয়েছে ৬০০ টাকা থেকে ৭৫০/৮০০ টাকা। আর বোম্বাই (চায়না-৩) জাতের লিচু বিক্রি হচ্ছে ১২০০ ও ১৪০০ টাকা দরে।
রাইজদিয়া গ্রামের এক লিচু ব্যবসায়ী জানান, সোনারগাঁয়ে এবার লিচুর ফলন খুবই কম হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় লিচু অনেকটা ঝরে পড়েছে। তাছাড়া আকারেও অনেকটা ছোট হয়েছে। শুরুতেই কদমি লিচু আকারভেদে ৫০০ থেকে ৭০০/৮০০ টাকা দরে বিক্রি করে থাকেন বিক্রেতারা। বোম্বাই (চায়না-৩) লিচুর দাম ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকা, পাতি লিচু ৩৫০/৪০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করে থাকেন। তবে এ বছর দাম একটু বেশি হবে।
উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, কদমি লিচুর পাশাপাশি ‘পাতি’ লিচু ও ‘চায়না-৩’ জাতের লিচু বেশি চাষ হয় এই উপজেলায়। ১০টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার প্রায় ৬০/৭০টি গ্রাম লিচুর জন্য প্রসিদ্ধ। তবে সোনারগাঁ পৌরসভার গোয়ালদী, হরিষপুর, দুলালপুর, পানাম গাবতলী, খাসনগর দীঘিরপাড়, চিলারবাগ, ইছাপাড়া, দত্তপাড়া, হাতকোপা, অজুন্দী, বাগমুছা, গোবিন্দপুর, লাহাপাড়া, বালুয়াদীঘিরপাড় ও বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের হাড়িয়া, হামছাদী, দামোদরদী, পঞ্চবটী, মোগরাপাড়া ইউনিয়নের ফুলবাড়িয়া ও গোহাট্টা এলাকায় সবচেয়ে বেশি লিচু বাগান রয়েছে। এসব এলাকার প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় ও আশপাশের ভিটাবাড়িতে লিচুর চাষ করা হয়।
আর সোনারগাঁয়ে লিচু পাকার জন্য চাষিরা কোনো কীটনাশক প্রয়োগ করে না। তবে লিচু বড় হওয়ার ক্ষেত্রে হরমোন জাতীয় ওষুধ, লিচুর কালার নষ্ট না হওয়ার জন্য ছত্রাকনাশক ও পোকার উপদ্রব বন্ধ করার জন্য তারা কীটনাশক ঔষধ প্রয়োগ করে থাকেন। এসব কীটনাশক ওষুধ মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলার কথা নয়। তবে পরিমাণে বেশি প্রয়োগ করলে অবশ্যই তা ক্ষতিকর।
লিচু ব্যবসা লাভজনক হওয়ায় প্রতিনিয়ত জমির মালিকরা নতুন নতুন লিচু গাছ রোপণ করছেন। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে সর্বদা লিচু চাষীদের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। তাছাড়া প্রতিটি ইউনিয়নের মাঠ পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাগণ লিচু চাষীদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।