
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার কাউলীবেড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা সালমা আক্তারের বিরুদ্ধে নামজারি কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। নাগরিক হয়রানি, অতিরিক্ত অর্থ দাবির অভিযোগের পর এবার সামনে এসেছে জমির মালিকানা ও নামজারি নিয়ে আরও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিক্রি হয়ে যাওয়া জমি, অবশিষ্ট সম্পত্তি না থাকা এবং একই জমি নিয়ে একাধিক ব্যক্তিকে নামজারির আশ্বাস দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
৬ শতাংশ জমি, নামজারিতে ০.৭৬ অযুতাংশ!
চাড়াভিটা ১০১ নম্বর মৌজার এসএ ৪৫ ও ১৩৭ নম্বর খতিয়ানের ৯২, ৯৩ ও ১৩০ নম্বর দাগ নিয়ে অভিযোগকারী হাফিজুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি তাঁর আপন চাচা আয়ুব আলী তালুকদারের কাছ থেকে ওই তিন দাগে মোট ৬ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। পরবর্তীতে তিনি জমিটির নামজারিও সম্পন্ন করেন।
অভিযোগকারীর দাবি, এক-দুই বছর পর জমির দাখিলা কাটতে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গেলে তাকে জানানো হয়, আগের নামজারিতে দাখিলা কাটা যাবে না; নতুন করে নামজারি করতে হবে। অভিযোগ অনুযায়ী, বাধ্য হয়ে তিনি পুনরায় নামজারি করেন এবং এ সময় ৮ হাজার টাকা দেওয়ার প্রয়োজন হয়।
কিন্তু পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে আরও চমকপ্রদ তথ্য সামনে আসে। অভিযোগকারীর দাবি, ৬ শতাংশ জমির পরিবর্তে নামজারি আবেদনে ০.৭৬ অযুতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে জমির প্রকৃত পরিমাণ, আবেদন এবং সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ডের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে কি না—তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
একই জমি নিয়ে একাধিক ব্যক্তিকে নামজারির আশ্বাস?
অভিযোগকারীর আরও দাবি, পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন—ওই জমি নিয়ে ইউনুস তালুকদার ও ইয়াকুব তালুকদারকেও পৃথকভাবে বিভিন্নভাবে প্রলুব্ধ করে নামজারি করে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।
এছাড়া কাউলীবেড়া ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর গ্রামের মীর মুজিবর নামের এক ব্যক্তিকে ঘিরেও পৃথক ‘কাল্পনিক নামজারি’র অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, চাড়াভিটা গ্রামের আতিয়ার তালুকদারের নামে থাকা ৮ শতাংশ জমি নিয়ে নামজারি করা হয়, যদিও ওই জমি পূর্বেই নুপুর আক্তার ও হাফিজুল ইসলামের কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়ার দাবি রয়েছে।
আরও অভিযোগ করা হয়েছে, চরমুকডোবা মৌজার ১০২ নম্বর খতিয়ানের বিএস ১১৭ নম্বর দাগে আতিয়ার তালুকদারের কোনো সম্পত্তি অবশিষ্ট না থাকার পরও সেখানে নামজারি করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ, ঝগড়া-বিবাদ এবং মামলা চলার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘুষের অভিযোগও গুরুতর
নামজারি করে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে সালমা আক্তারের বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ এই প্রতিবেদনের হাতে নেই। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট নামজারি নথি, দলিল, খতিয়ান, দাখিলা, আবেদনপত্র এবং অফিসের রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ডিসিকে নিয়ে অশালীন ভাষার অভিযোগ
সালমা আক্তারের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, তিনি ফরিদপুরের জেলা প্রশাসককে নিয়ে অশালীন ভাষা ব্যবহার করেছেন। তবে এই অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
এরই মধ্যে ভাঙ্গা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাদরুল আলম বদলি হয়েছেন, অথচ অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সালমা আক্তার একই কর্মস্থলে বহাল রয়েছেন। ফলে ভুক্তভোগী ও অভিযোগকারীদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—এত অভিযোগের পরও কেন অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হচ্ছে না?
সাংবাদিকদের অবরুদ্ধ ও অডিও-ভিডিও মুছে ফেলার অভিযোগ
গত ৬ সেপ্টেম্বর অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে ভাঙ্গা উপজেলা ভূমি অফিসে গেলে সাংবাদিকদের প্রায় ১ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ ওঠে। এ সময় সাংবাদিকদের মোবাইল ফোন ও ক্যামেরা নেওয়া এবং ধারণ করা অডিও-ভিডিও মুছে ফেলার অভিযোগও রয়েছে। সাংবাদিক কুমকুমের মেমোরি কার্ড নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
ঘটনাটি নিয়েও প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সালমার বক্তব্য পাওয়া যায়নি
এসব অভিযোগের বিষয়ে সালমা আক্তারের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে মোবাইল ফোনে মেসেজ পাঠানো হয়। অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মেসেজটি দেখা হলেও কোনো জবাব দেওয়া হয়নি।
ফলে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত সালমা আক্তারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
এখন মূল প্রশ্ন—নামজারির নেপথ্যে কী?
একই জমি নিয়ে একাধিক ব্যক্তিকে নামজারির আশ্বাস, বিক্রি হয়ে যাওয়া জমির নামজারি, ৬ শতাংশের পরিবর্তে ০.৭৬ অযুতাংশের আবেদন এবং পুনরায় নামজারির নামে ৮ হাজার টাকা দেওয়ার অভিযোগ—সব মিলিয়ে কাউলীবেড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নামজারি কার্যক্রম নিয়ে উঠছে গুরুতর প্রশ্ন।
ভুক্তভোগীদের দাবি, নামজারি সংক্রান্ত সব নথি, পূর্বের দলিল, খতিয়ান, দাখিলা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অফিসের রেকর্ড যাচাই করে দ্রুত নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত করা হোক।
বক্তব্য নেয়ার জন্য সালমাকে কল করা হলে তিনি রিসিভ করেননি, মেসেজে বক্তব্য চাইলে তিনি দেখে উত্তর দেননি।