বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৮ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম ::
রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রের দুর্নীতির চক্রে রাষ্ট্রের ক্ষয় আওয়ামী লীগের নৈরাজ্যের প্রতিবাদে বন্দরে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনৈতিক আবদার না মেটানোয় ভূমি কর্মকর্তা দুলালের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ টঙ্গিবাড়ীতে মহিলা দলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী বহুতল ভবন হিসেবে নতুন রূপে ফিরবে জিয়া হল: এমপি কালাম কুমির আতঙ্কে দিন পার করছেন বন্দরের তিনগাঁওবাসী, উদ্ধারে চলছে তৎপরতা বন্দরে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে টুটুল হত্যা, গ্রেপ্তার তাফসীর স্বাধীন রাষ্ট্র, পরাধীন মানুষ—বাস্তবতার নির্মম প্রতিচ্ছবি ভাঙ্গায় নামজারি নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ, বিক্রি হয়ে যাওয়া জমিতেও ‘কাল্পনিক নামজারি’

স্বাধীন রাষ্ট্র, পরাধীন মানুষ—বাস্তবতার নির্মম প্রতিচ্ছবি

  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭.৩৮ এএম
  • ৭ বার পড়া হয়েছে

মোঃ মামুন হোসেন : স্বাধীনতা শুধু একটি ভূখণ্ড, পতাকা কিংবা মানচিত্রের নাম নয়। স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ মানুষের অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ। তাই একটি রাষ্ট্র রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হলেই তার প্রতিটি নাগরিক বাস্তবে স্বাধীন—এ কথা বলা যায় না।আমাদের সবচেয়ে বড় আত্মজিজ্ঞাসা হওয়া উচিত—আমরা কি শুধু স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছি, নাকি স্বাধীন মানুষও তৈরি করতে পেরেছি?একজন নাগরিক যখন ন্যায্য অধিকার পেতে সুপারিশ খোঁজেন, সরকারি সেবা পেতে পরিচয় বা প্রভাবের প্রয়োজন হয়, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে ভয় পান কিংবা ন্যায়বিচারের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকেন—তখন কাগজের স্বাধীনতা আর বাস্তব জীবনের স্বাধীনতার মধ্যে তৈরি হয় গভীর ব্যবধান।স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় সাধারণ মানুষের জীবনে।শ্রমিক ন্যায্য মজুরি পাচ্ছেন কি না, কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন কি না, শিক্ষার্থী মেধার ভিত্তিতে সুযোগ পাচ্ছেন কি না, চাকরিপ্রার্থী যোগ্যতার মূল্য পাচ্ছেন কি না, রোগী সামর্থ্যের মধ্যে চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরেই রাষ্ট্রের স্বাধীনতার সামাজিক মূল্য নিহিত।উন্নয়নও শুধু রাস্তা, সেতু, ভবন কিংবা প্রযুক্তির বিস্তারে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের জীবনযাত্রার নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, সামাজিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ।ক্ষমতার সংস্কৃতি বদলানো জরুরি-
ক্ষমতা যখন সেবার বদলে আধিপত্যের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন নাগরিক নিজের অধিকার প্রয়োগের বদলে সুবিধা পাওয়ার পথ খোঁজেন। এতে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়, জবাবদিহিতা কমে এবং নাগরিক স্বাধীনতার ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ে।তবে সব দায় রাষ্ট্রের নয়। সমাজের ভেতরেও আত্মসমালোচনা জরুরি। আমরা দুর্নীতির বিরোধিতা করি, অথচ ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য অনেক সময় আপস করি। স্বজনপ্রীতির সমালোচনা করি, আবার নিজের পরিচিতজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার চেষ্টা করি। এই দ্বৈত মানসিকতাও পরিবর্তন করতে হবে।স্বাধীনতাকে মানুষের জীবনে কার্যকর করতে হলে বক্তৃতা ও স্লোগানের বাইরে পরিমাপযোগ্য সংস্কার কর্মসূচি প্রয়োজন। এর কয়েকটি মৌলিক ধাপ হতে পারে—১. নাগরিক সেবা সহজ ও সময়বদ্ধ করা:প্রতিটি সরকারি সেবার নির্দিষ্ট সময়সীমা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সরকারি ফি প্রকাশ্যে জানাতে হবে। অযথা হয়রানি হলে অভিযোগ ও প্রতিকারের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।২. দুর্নীতি প্রতিরোধে ডিজিটাল স্বচ্ছতা:
যেখানে সম্ভব সরকারি আবেদন, অনুমোদন, ফি প্রদান ও সেবা গ্রহণকে ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। এতে মধ্যস্বত্বভোগী ও অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ কমবে।
৩. প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা:প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সেবার মান, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কার্যক্রম নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে। শুধু অভিযোগ গ্রহণ নয়, অভিযোগের ফলাফলও নাগরিককে জানাতে হবে।৪. আইনের সমান প্রয়োগ:ব্যক্তির পরিচয়, অর্থ, রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব যেন আইনের প্রয়োগে বৈষম্য তৈরি না করে—এটি নিশ্চিত করা জরুরি। বিচারপ্রক্রিয়ায় অযথা বিলম্ব কমাতে প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে।৫. নিয়োগ ও সুযোগে মেধা ও স্বচ্ছতা:চাকরি, শিক্ষা ও সরকারি সুযোগে যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ার তথ্য, ফলাফল ও অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা যত বেশি স্বচ্ছ হবে, আস্থাও তত বাড়বে।৬. স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা:নাগরিকের সবচেয়ে কাছের প্রতিষ্ঠান স্থানীয় সরকার। রাস্তা, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি, স্বাস্থ্য ও নাগরিক সেবার বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা, বাজেট ও বাস্তবায়নের তথ্য জনগণের সামনে প্রকাশ করা উচিত।৭. নাগরিকের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষা:বিদ্যালয় থেকেই সংবিধান, নাগরিক অধিকার, আইন, দায়িত্ব, সহনশীলতা ও দুর্নীতিবিরোধী মূল্যবোধ সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা দিতে হবে। সচেতন নাগরিক ছাড়া কোনো সংস্কারই দীর্ঘস্থায়ী হয় না।৮. সংস্কারের অগ্রগতি প্রকাশ্যে পরিমাপ:কোন সংস্কার কখন বাস্তবায়িত হবে, দায়িত্ব কার এবং কতটা অগ্রগতি হয়েছে—এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট সূচক ও সময়সীমা থাকা দরকার। সংস্কারকে শুধু ঘোষণা নয়, ফলাফল দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে।স্বাধীনতা শুধু অতীতের কোনো অর্জন নয়; এটি প্রতিদিন রক্ষা ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব। জাতীয় পতাকা রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার প্রতীক, কিন্তু মানুষের মর্যাদা ও অধিকার সেই স্বাধীনতার প্রাণ।আমাদের এখন আত্মপ্রবঞ্চনা নয়, আত্মজিজ্ঞাসা প্রয়োজন। স্বাধীন দেশে কেন মানুষ অন্যায়ের কাছে অসহায় হবে? কেন যোগ্যতার চেয়ে পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হবে? কেন নাগরিক অধিকার প্রয়োগে ভয় কাজ করবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বাস্তব পরিবর্তন ঘটানোই স্বাধীনতার প্রকৃত চর্চা।কাগজে স্বাধীনতা অর্জন করা যায় একদিনে; কিন্তু মানুষের জীবনে স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করতে লাগে ন্যায়বিচার, সুশাসন, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান এবং সচেতন নাগরিক সমাজ।শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় পরিচয় রাষ্ট্রের সীমানা নয়—নাগরিকের মর্যাদা।
যেদিন একজন সাধারণ মানুষ কোনো পরিচয়, তদবির কিংবা ভয় ছাড়াই নিজের অধিকার দাবি করতে পারবেন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তাকে নাগরিক হিসেবে মর্যাদা দিয়ে সেবা দেবে—সেদিনই কাগজের স্বাধীনতা বাস্তব জীবনের স্বাধীনতায় রূপ নেবে।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2021 rudrabarta24.net
Theme Developed BY ThemesBazar.Com

sakarya bayan escort escort adapazarı Eskişehir escort