
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলা ভূমি অফিসে তথ্য সংগ্রহ ও লিখিত অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রায় ১ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সাংবাদিকদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও ব্যক্তিগত ক্যামেরা নেওয়া, ধারণকৃত ভিডিও মুছে ফেলা এবং একটি মেমোরি কার্ড ফেরত না দেওয়ারও অভিযোগ করেছেন সাংবাদিক কুমকুম।
ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ পরও বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। এরই মধ্যে ভাঙ্গা উপজেলার সংশ্লিষ্ট এসি ল্যান্ড বদলি হলেও, কাউলীবেড়া ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা সালমা আক্তারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক পরিবর্তন বা কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না—এমন দাবি করেছেন অভিযোগকারী সাংবাদিকরা।
সাংবাদিক কুমকুম জানান, তিনি দৈনিক রুদ্রবার্তার ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতা করছেন। সম্পাদক শাহ আলম তালুকদারের অনুমতি এবং টিম লিডার সাংবাদিক হাফিজুল ইসলাম তালুকদারের সফরসঙ্গী হিসেবে গত ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে তারা ভাঙ্গা উপজেলা ভূমি অফিসে যান। উদ্দেশ্য ছিল কাউলীবেড়া ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা সালমা আক্তারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়া।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সালমা আক্তারের বিরুদ্ধে কথিত ঘুষ লেনদেন, সাধারণ মানুষকে হয়রানি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যসহ বিভিন্ন অভিযোগের তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। এসব বিষয়ে থাকা ভিডিও ও অডিওসহ প্রাসঙ্গিক তথ্য তারা উপজেলা ভূমি অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে উপস্থাপন করেন।
সাংবাদিক কুমকুমের দাবি, তাদের টিম লিডার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে অত্যন্ত সৌজন্যের সঙ্গে সালমা আক্তারের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি ভিডিও বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে লিখিত বক্তব্য দেওয়ার কথা জানান এবং কিছু সময় অপেক্ষা করতে বলেন। তারা সেই অনুযায়ী অফিসে অবস্থান করছিলেন।
পরবর্তীতে হঠাৎ একদল ব্যক্তি অফিসে প্রবেশ করে তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে নেয় এবং কুমকুমের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত ক্যামেরাটিও শরীর থেকে হাত দিয়ে নিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ সময় তাদের সঙ্গে অশালীন ও আপত্তিকর ভাষায় কথা বলা, হুমকি ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করার অভিযোগও রয়েছে।
সাংবাদিক কুমকুমের দাবি, পুরো ঘটনায় তারা প্রায় ১ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন। এ সময় ভাঙ্গা সার্কেলের সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা এবং ফরিদপুরের জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে তারা সেখান থেকে বের হতে সক্ষম হন বলে জানান।
ঘটনার পর ধারণকৃত কিছু ভিডিও ও তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে বলে তারা দেখতে পান এবং একটি মেমোরি কার্ডও ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন। ওই মেমোরি কার্ডে ব্যক্তিগত তথ্য থাকায় নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক কুমকুম।
ঘটনার পর তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে জানান। প্রথমে নারায়ণগঞ্জের ভিক্টোরিয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেন এবং পরবর্তীতে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয় বলে দাবি করেন তিনি। এ-সংক্রান্ত চিকিৎসার কাগজপত্রও প্রয়োজনে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপনের কথা জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে ঘটনার বিষয়ে ভাঙ্গা থানায় সাধারণ ডায়েরি করার জন্য একাধিকবার আবেদন করেও তা গ্রহণ করা হয়নি—এমন অভিযোগ করেছেন সাংবাদিকদের পক্ষ। বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন, ভূমি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
এসি ল্যান্ড বদলি, কিন্তু সালমাকে ঘিরে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে
ঘটনার পর ভাঙ্গা উপজেলার এসি ল্যান্ড বদলি হওয়ার বিষয়টি সামনে এলেও সাংবাদিকদের প্রশ্ন—কাউলীবেড়া ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা সালমা আক্তারের বিরুদ্ধে যদি এতগুলো অভিযোগ উত্থাপিত হয়ে থাকে, তাহলে সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের অগ্রগতি কোথায়?
অভিযোগকারীদের দাবি, এসি ল্যান্ড বদলি হলেও সালমা আক্তারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন বা কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং প্রশাসনিক তদন্তের দাবি আরও জোরালো হচ্ছে।
তবে সালমা আক্তারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো কোনো তদন্ত বা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি করা হচ্ছে না। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সালমা আক্তারের বক্তব্য নেওয়া এবং তা প্রকাশ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাংবাদিকদের প্রশ্ন
১. সরকারি দপ্তরে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ১ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট অবরুদ্ধ রাখার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কবে?
২. সাংবাদিকদের মোবাইল ফোন ও ক্যামেরা নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা কী?
৩. ধারণকৃত ভিডিও ও তথ্য মুছে ফেলার অভিযোগের তদন্ত হয়েছে কি না?
৪. ফেরত না পাওয়া মেমোরি কার্ডের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি?
৫. সালমা আক্তারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর তদন্তের অগ্রগতি কী?
৬. সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বদলি হলেও অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয় কেন?
৭. সাংবাদিকদের নিরাপদে তথ্য সংগ্রহের পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ কী?
সাংবাদিকদের দাবি
সাংবাদিক কুমকুম ও তার সহকর্মীরা পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত, ১ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট অবরুদ্ধ রাখার অভিযোগের সত্যতা উদঘাটন, সাংবাদিকদের কাছ থেকে মোবাইল/ক্যামেরা নেওয়া ও তথ্য মুছে ফেলার অভিযোগ তদন্ত, মেমোরি কার্ড ও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সালমা আক্তারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন।
সাংবাদিক কুমকুম বলেন, তারা কারও ব্যক্তিগত শত্রু নন। জনস্বার্থে তথ্য সংগ্রহ করাই তাদের কাজ। কোনো অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক, আর অভিযোগ মিথ্যা হলে অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্যও প্রকাশ করা হোক। কিন্তু তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও পেশাগত অধিকার যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়।
সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা জনসম্মুখে তুলে ধরার দাবি জানানো হয়েছে।