বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১৭ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম ::
সৌদিতে কোরআন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হাফেজদের সংবর্ধনা প্রধানমন্ত্রীর মদনপুর রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় পরিদর্শনে ইউএনও শিবানী সরকার মদনপুর ইউপিতে ইউএনও শিবানী সরকার: ডেঙ্গু ঠেকাতে পরিচ্ছন্নতায় জোর, জনভোগান্তি চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের নির্দেশ গোগনগর থেকে নারায়ণগঞ্জের সাহিত্যাঙ্গন—এক স্বপ্নবান মানুষের যাত্রা সিদ্ধিরগঞ্জে সজীব হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবীতে মানববন্ধন প‌দের লো‌ভে জে‌গে‌ উঠেছে লাপাত্তা মামা-ভা‌গ্নে ! খানপুর হাসপাতালে ১৯ বছর ধরে একই পদে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আক্তারুজ্জামানকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাব ও দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার অভিযোগ ইটের ফাঁক দিয়ে টাকা দিলেই উপর থেকে নেমে আসে মাদক যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা শাহেনশাহর মা জাহানারা আর নেই সরকারি সময়সূচি উপেক্ষার অভিযোগ: কাউলীবেড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সেবা নিতে এসে হয়রানির শিকার সাধারণ মানুষ

গোগনগর থেকে নারায়ণগঞ্জের সাহিত্যাঙ্গন—এক স্বপ্নবান মানুষের যাত্রা

  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১.১০ পিএম
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

রবিউস সানি টুটুল : নারায়ণগঞ্জের গোগনগর (বাড়ির টেক) এলাকার একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তাঁর পিতা আলহাজ্ব মোঃ জহির হোসেন এবং মাতা নাজমা বেগম। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, অধ্যবসায়ী ও সংগ্রামী একজন শিক্ষার্থী। জ্ঞানার্জনের প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহই পরবর্তী জীবনে তাঁকে সাহিত্যচর্চা ও গবেষণামূলক লেখালেখির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।একজন মানুষের বহুমাত্রিক পরিচয় ও সমাজের প্রতি দায়।সাহিত্য থেকে মানবিকতা—একটি নিরলস পথচলার গল্প কখনো কখনো কোনো মানুষকে কাছ থেকে দেখলে সত্যিই বিস্মিত হতে হয়—একজন মানুষের ভেতরে এতগুলো সত্তা কীভাবে একসঙ্গে বিকশিত হয়? লেখক, কলামিস্ট, সাংবাদিক, সাহিত্য সংগঠক, সমাজকর্মী, মানবাধিকারকর্মী এবং সর্বোপরি একজন মানবিক মানুষ—একজন ব্যক্তির পরিচয়ের সঙ্গে যখন এতগুলো ভূমিকা যুক্ত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, তাঁর কর্মপরিধির সীমা কোথায়?
নারায়ণগঞ্জের সাহিত্য ও সামাজিক অঙ্গনে মামুন হোসেন তেমনই একটি বহুমাত্রিক নাম। তাঁকে কেবল একজন লেখক হিসেবে দেখলে তাঁর কাজের ব্যাপ্তিকে ছোট করে দেখা হবে। আবার কেবল সংগঠক কিংবা সমাজকর্মী হিসেবেও তাঁর পরিচয় সম্পূর্ণ হয় না। তাঁর কর্মকাণ্ডের নানা স্তর পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত—সাহিত্য তাঁকে সমাজের কাছে নিয়ে যায়, সাংবাদিকতা তাঁকে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়, মানবাধিকারচর্চা তাঁকে মানুষের অধিকারের প্রশ্নে সোচ্চার করে এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড তাঁকে মানুষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রাখে।আজকের সময়ে এমন সমন্বিত পথচলা সহজ নয়। কারণ আমরা এমন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যখন পরিচিতি অনেক, কিন্তু গভীরতা কম; পদ-পদবি অনেক, কিন্তু দায়বদ্ধতা সীমিত; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্যের বিস্ফোরণ আছে, কিন্তু বাস্তব জীবনে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম। এই বাস্তবতার বিপরীতে একজন মানুষ যদি নিজের সময়, শ্রম ও চিন্তাকে সমাজের জন্য ব্যয় করেন, তবে তাঁর সেই প্রচেষ্টাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা জরুরি।মামুন হোসেনের সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রটিও তাই আলাদাভাবে আলোচনার দাবি রাখে। একজন লেখকের আসল শক্তি তাঁর পরিচিতিতে নয়, তাঁর চিন্তায়। তিনি কী দেখছেন, কী নিয়ে ভাবছেন এবং সমাজের কোন অস্বস্তিকর সত্যকে শব্দে প্রকাশ করতে সাহস করছেন—সেখানেই একজন লেখকের প্রকৃত পরিচয়।সাহিত্য কখনো শুধু শব্দের অলংকার নয়। সাহিত্য মানুষের বিবেককে প্রশ্ন করে, সমাজের অসংগতি তুলে ধরে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শেখায়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সাহিত্য সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ আরও তাৎপর্যপূর্ণ।
‘শব্দশৈলী সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদ’ এবং ‘কলকণ্ঠ সাহিত্য ফোরাম’-এর মতো সংগঠন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মামুন হোসেন শুধু নিজের সাহিত্যচর্চার পরিসর তৈরি করেননি; বরং অন্যদেরও সঙ্গে নিয়ে চলার একটি সাংগঠনিক ক্ষেত্র তৈরির চেষ্টা করেছেন। একজন লেখক নিজের জন্য লিখতে পারেন, কিন্তু একজন সাহিত্য সংগঠককে অন্যের জন্যও দরজা খুলে দিতে হয়। নতুন লেখকের লেখা শুনতে হয়, তরুণদের উৎসাহ দিতে হয়, সাহিত্যসভা করতে হয় এবং অনেক সময় নিজের স্বার্থের বাইরে গিয়ে একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করতে হয়।নারায়ণগঞ্জের মতো ঐতিহ্যবাহী একটি শহরে এই সাংগঠনিক ভূমিকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এই শহরের সাহিত্য-সংস্কৃতির ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে অসংখ্য কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক পরিসরকে সমৃদ্ধ করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রজন্মের সংগঠকদের কাজ হলো ঐতিহ্যকে শুধু স্মরণ করা নয়, নতুন প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া।আর এখানেই মামুন হোসেনের মতো মানুষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে গোগনগর ও আশপাশের এলাকায় সাহিত্য ও সামাজিক কর্মকাণ্ডকে সংগঠিত করার প্রচেষ্টা স্থানীয় পর্যায়ে একটি নতুন সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি করতে পারে। কারণ রাজধানীকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক চর্চার বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যে অসংখ্য প্রতিভা ছড়িয়ে আছে, তাদের সামনে এগিয়ে আসার সুযোগ তৈরি করা জরুরি। প্রতিভা কখনো শুধু শহরের বড় মঞ্চে জন্ম নেয় না; প্রতিভা জন্ম নেয় পাড়া-মহল্লায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, ছোট সাহিত্যসভায়, পাঠচক্রে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে।এই বাস্তবতায় একজন সংগঠকের কাজ কেবল অনুষ্ঠান আয়োজন নয়; বরং মানুষ তৈরি করা।মামুন হোসেনের আরেকটি পরিচয় মানবাধিকারকর্মী হিসেবে। এই পরিচয় তাঁর সাহিত্যিক সত্তার সঙ্গে একটি গভীর যোগসূত্র তৈরি করে। কারণ যে মানুষ মানুষের কথা লিখবেন, তাঁর কাছে মানুষের অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা। সমাজের বৈষম্য, অবিচার, অধিকারবঞ্চনা, অন্যায় কিংবা সামাজিক অসঙ্গতি নিয়ে কথা বলার জন্য শুধু কলম যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মানবিক সাহস ও সামাজিক দায়বদ্ধতা।তাঁর সাংবাদিকতা ও কলাম লেখার ক্ষেত্রেও এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখা যায়। একজন সাংবাদিক সমাজের ঘটনাকে তুলে ধরেন, একজন কলামিস্ট সেই ঘটনার ব্যাখ্যা করেন, আর একজন সাহিত্যিক মানুষের অন্তর্গত অনুভূতিকে শব্দ দেন। এই তিনটি সত্তা যখন একজন মানুষের মধ্যে মিলিত হয়, তখন সমাজকে দেখার দৃষ্টিও বহুমাত্রিক হয়।তবে সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে যে পরিচয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো—তিনি মানুষের জন্য সময় দেন।এটি হয়তো শুনতে খুব সাধারণ একটি কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বর্তমান সময়ে মানুষের জন্য সময় দেওয়াই কঠিন হয়ে উঠেছে। আমরা সবাই ব্যস্ত; কিন্তু ব্যস্ততার মাঝেও কে কার কথা শুনছে, কে তরুণদের উৎসাহ দিচ্ছে, কে সমাজের সমস্যা নিয়ে ভাবছে—এই প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ।একজন মানুষ যতই পরিচিত বা প্রতিষ্ঠিত হন, যদি তিনি তাঁর চারপাশের মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান, তবে তাঁর অর্জনের সামাজিক মূল্য কমে যায়। বিপরীতে একজন মানুষ যদি পরিচিতির উচ্চতায় থেকেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, তরুণদের সময় দেন এবং সমাজের সমস্যা নিয়ে ভাবেন, তাহলে তাঁর সামাজিক গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়।এই কারণেই ‘হাই প্রোফাইল’ হওয়ার চেয়ে ‘মানুষের মানুষ’ হওয়া অনেক বড় পরিচয়।মামুন হোসেনের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার জায়গাটি এখানেই। তাঁর পরিচয়ের তালিকা দীর্ঘ হতে পারে, কিন্তু তাঁর প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া উচিত তাঁর কর্মের সামাজিক প্রভাব দিয়ে। তিনি কতটি পদে আছেন—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তাঁর উদ্যোগে কতজন তরুণ সাহস পেয়েছে; কতজন লেখার সুযোগ পেয়েছে; কতজন সামাজিক কাজে যুক্ত হয়েছে; কতজন মানুষ মানবিকতার কথা ভাবতে শিখেছে।
সমাজের প্রকৃত পরিবর্তন কখনো একজন মানুষের একক প্রচেষ্টায় আসে না। কিন্তু পরিবর্তনের জন্য কিছু মানুষকে সামনে আসতেই হয়। তাঁদের কেউ কলম ধরেন, কেউ সংগঠন গড়েন, কেউ মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলেন, কেউ তরুণদের পাশে দাঁড়ান। এই সবগুলো কাজ যখন একজন মানুষের জীবনে একত্রিত হয়, তখন তাঁর পথচলা ব্যক্তিগত সাফল্যের সীমা অতিক্রম করে সামাজিক সম্পদে পরিণত হতে পারে।তাই মামুন হোসেনকে নিয়ে বিস্মিত হওয়ার পাশাপাশি তাঁকে একটি দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি—আপনার সামনে এখন আরও বড় কাজের সুযোগ রয়েছে। সাহিত্যকে আরও গভীর করতে হবে, নতুন প্রজন্মকে পাঠাভ্যাসে ফিরিয়ে আনতে হবে, সংগঠনকে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার বাইরে নিয়ে যেতে হবে এবং মানবিক মূল্যবোধকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে।
কারণ একজন মানুষের প্রকৃত উচ্চতা তাঁর পদবিতে নয়, তাঁর প্রভাবের গভীরতায়।একদিন হয়তো পদ-পদবির অনেক কিছুই বদলে যাবে। সংগঠনের নামও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু একজন মানুষ যদি তাঁর সময়ের তরুণদের মনে চিন্তার আলো জ্বালাতে পারেন, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিতে পারেন এবং সাহিত্য ও মানবিকতার একটি ইতিবাচক উত্তরাধিকার রেখে যেতে পারেন—তাহলে তাঁর পথচলা কখনো হারিয়ে যায় না।
সেই অর্থে মামুন হোসেনের গল্প এখনও শেষ হয়নি। এটি একটি চলমান অধ্যায়—যেখানে কলম আছে, সংগঠন আছে, সমাজ আছে, মানুষ আছে এবং আছে আরও ভালো একটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রত্যাশা।তাঁর প্রতি ভালোবাসা থাকুক, শ্রদ্ধা থাকুক। তবে তার চেয়েও বড় কথা—তাঁর এই পথচলা যেন আরও দীর্ঘ হয়, আরও মানুষের কাছে পৌঁছায় এবং নারায়ণগঞ্জের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানবিক সমাজ নির্মাণে আরও দৃশ্যমান ভূমিকা রাখে।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2021 rudrabarta24.net
Theme Developed BY ThemesBazar.Com

sakarya bayan escort escort adapazarı Eskişehir escort