
নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল—খানপুরে দীর্ঘদিন ধরে একই পদে কর্মরত একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্টকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ডেন্টাল) মো. আক্তারুজ্জামান।
তথ্য অনুসন্ধানে পাওয়া নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি অনুযায়ী, মো. আক্তারুজ্জামান ২০০৭ সালে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা হাসপাতালে যোগদান করেন। ২০২৬ সালেও তিনি একই প্রতিষ্ঠানে একই পদে কর্মরত রয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। অর্থাৎ প্রায় ১৯ বছর ধরে একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
সরকারি নিয়োগসংক্রান্ত নথিতে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ডেন্টাল) পদটি গ্রেড-১১-এর পদ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
একই প্রতিষ্ঠানে এত দীর্ঘ সময়—বিধি কী বলে?
সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়ন প্রশাসনিক প্রয়োজন, জনস্বার্থ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নীতিমালার আওতায় হয়ে থাকে। তবে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ডেন্টাল) পদে একজন কর্মী সর্বোচ্চ সাড়ে তিন বছর একই প্রতিষ্ঠানে থাকতে পারবেন—এমন দাবির সুনির্দিষ্ট সরকারি প্রজ্ঞাপন বা আদেশের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
তাই প্রশ্ন উঠছে—যদি সংশ্লিষ্ট পদে নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে বদলির কোনো বাধ্যতামূলক বিধান থেকে থাকে, তাহলে মো. আক্তারুজ্জামান কীভাবে প্রায় ১৯ বছর একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন? আর যদি বিশেষ প্রশাসনিক আদেশ, জনস্বার্থ বা অন্য কোনো বৈধ কারণে তিনি একই কর্মস্থলে থেকে থাকেন, তাহলে সেই আদেশের কপি ও কারণ জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ের শাসনামলে আক্তারুজ্জামান হাসপাতালের অভ্যন্তরে প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেছিলেন। তার প্রভাবের কারণে চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্টসহ অন্যান্য কর্মচারীদের একটি অংশ নাকি অস্বস্তি ও ভয়ের মধ্যে থাকতেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।
৫ আগস্টের পর অবস্থান পরিবর্তনের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আক্তারুজ্জামান তার অবস্থান পরিবর্তন করে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেন এবং বিএনপিপন্থী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করে একই পদে বহাল থাকার চেষ্টা করেন।
তবে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার আনুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি চাকরিতে সুবিধা নিয়েছেন কি না—এ বিষয়ে সরকারি নথি ও নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
১৯ বছরে একই কর্মস্থল—প্রশাসনের কাছে প্রশ্ন
একজন সরকারি কর্মচারী দীর্ঘ ১৯ বছর একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকলে তার বদলি, পদায়ন, সংযুক্তি কিংবা একই কর্মস্থলে থাকার অনুমোদনসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার কাছে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—
১. মো. আক্তারুজ্জামান ঠিক কোন তারিখে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা হাসপাতালে যোগদান করেন?
২. ২০০৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত তার বদলি বা পদায়নের কোনো আদেশ হয়েছিল কি না?
৩. হয়ে থাকলে সেসব আদেশ বাস্তবায়িত হয়েছিল কি না?
৪. একই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন থাকার জন্য কোনো বিশেষ অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না?
৫. তার চাকরির সার্ভিস রেকর্ডে এ বিষয়ে কী উল্লেখ রয়েছে?
৬. স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বদলি ও পদায়ন নীতিমালা অনুযায়ী একই প্রতিষ্ঠানে এত দীর্ঘ সময় থাকার সুযোগ আছে কি না?
সম্পদের বিষয়েও অনুসন্ধানের দাবি
প্রতিবেদনের সূত্রগুলো আরও দাবি করছে, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগকে কেন্দ্র করে আক্তারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও সম্পদ বৃদ্ধির অভিযোগ রয়েছে।
তবে তার বিরুদ্ধে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য নথি বা সরকারি তদন্তের ফলাফল ছাড়া এটিকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দাবি করা সমীচীন নয়।
তার আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, চাকরির বেতন-ভাতা এবং তার নামে বা পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের তথ্য যাচাই করা হলে অভিযোগের সত্যতা বা অসত্যতা স্পষ্ট হতে পারে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য কী?
মো. আক্তারুজ্জামানের দীর্ঘ ১৯ বছর একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকার বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হবে।
প্রশ্ন হচ্ছে—একই হাসপাতালে প্রায় দুই দশক ধরে একই পদে একজন সরকারি কর্মচারীর অবস্থান কি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ, নাকি এর পেছনে রয়েছে বিশেষ কোনো অনুমোদন বা প্রভাব?
বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
(চলবে…)