
ফরিদপুর প্রতিনিধি: ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার কাউলীবেড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা সালমা আক্তারের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। জমির নামজারি, রেকর্ড সংশোধন, ভূমি সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে হয়রানি, সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণসহ নানা অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা না হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, একই সম্পত্তি একাধিকবার নামজারি, এক দাগের জমি অন্য দাগের খতিয়ানে নামজারি এবং মাঠ রেকর্ডভুক্ত জমি পুনরায় নামজারি করার আশ্বাস দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
২১ শতাংশ জমি কিনে আরও ২১ শতাংশ পাওয়ার আশ্বাস?
অভিযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘিরে জানা যায়, ইউনুস তালুকদার নামে এক ব্যক্তি পারিবারিকভাবে তার ছোট ভাই আয়ুব তালুকদারের কাছ থেকে ৩ জুলাই ২০০১ সালে ২১ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। সংশ্লিষ্ট জমির দলিল হিসেবে অভিযোগকারীর পক্ষ থেকে দলিল নং ৫০৯৩, তারিখ ০৪/১১/১৯৮২; দলিল নং ২২৯২, তারিখ ০৩/০৬/২০০১ এবং দলিল নং ৫৬০৬, তারিখ ১৪/১১/২০০২—এ ধরনের নথির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব নথি ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ডের ভিত্তিতে পরিবারের একাধিক খতিয়ানে জমির রেকর্ড থাকার বিষয়টিও যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
অভিযোগকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, পরবর্তীতে কাউলীবেড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা সালমা আক্তার ওই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে—এমনভাবে নামজারি সংক্রান্ত আশ্বাস দেন। অভিযোগ রয়েছে, ২১ শতাংশ জমি কেনার পর অতিরিক্ত আরও ২১ শতাংশ জমি নামজারি করে দেওয়ার কথা বলা হয়।
বিষয়টি জানতে পেরে অভিযোগকারী ভূমি অফিসে গিয়ে নামজারির ব্যাপারে আপত্তি জানান। এরপর সংশ্লিষ্ট নামজারি বাতিল করা হয় বলে দাবি তার। তবে অভিযোগকারীর ভাষ্য, তার সামনেই ওই কর্মকর্তা বলেন—ভবিষ্যতে এটি আবার নামজারি হয়ে যেতে পারে।
মাঠ রেকর্ডে জমির অবস্থান, তবুও পুনরায় নামজারির প্রশ্ন
ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে অভিযোগকারী প্রথমে ভাঙ্গা উপজেলা ভূমি অফিসে যোগাযোগ করেন। সেখানে তাকে জানানো হয়, সংশ্লিষ্ট পুরোনো রেকর্ড ও মাঠ রেকর্ডের তথ্য নিশ্চিত করতে ফরিদপুর ভূমি সেটেলমেন্ট অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।
পরে ফরিদপুর ভূমি সেটেলমেন্ট অফিসে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট জমির মাঠ রেকর্ড সংক্রান্ত তথ্য ও নথি পাওয়া গেছে বলে অভিযোগকারীর দাবি। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—কোনো জমি যদি পূর্বেই যথাযথভাবে রেকর্ডভুক্ত হয়ে থাকে, তাহলে একই জমি নিয়ে নতুন করে নামজারি বা অতিরিক্ত জমি নামজারির আশ্বাস দেওয়ার সুযোগ কীভাবে তৈরি হয়?
তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রেকর্ড, নামজারি মামলা, আদেশ এবং দলিলের পূর্ণাঙ্গ যাচাই প্রয়োজন।
এক দাগের জমি অন্য দাগের খতিয়ানে নামজারির অভিযোগ
ভূমি অফিসটির বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, এক দাগের জমি অন্য দাগের খতিয়ানে নামজারি করার মতো অনিয়ম ঘটেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে একই পরিবারের চাচা-ভাতিজা, ভাই-ভাই এবং অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ তৈরি হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন—কোনো নামজারি করার আগে দলিল, দাগ, খতিয়ান, পরিমাণ, পূর্ববর্তী রেকর্ড ও মালিকানার ধারাবাহিকতা যাচাই করার পরও যদি ভুল রেকর্ড তৈরি হয়, তাহলে এর দায় কার?
অভিযোগের পর অভিযোগ, ব্যবস্থা কোথায়?
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি অভিযোগকারীদের। এর মধ্যে রয়েছে—
ভাঙ্গা উপজেলা ভূমি অফিসে অভিযোগ;
ফরিদপুর জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ;
দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ;
ভূমি মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ;
সাংবাদিক হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগ;
প্রেস কাউন্সিলসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ।
অভিযোগকারীদের দাবি, এত অভিযোগের পরও একই ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ওই কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন অব্যাহত রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—অভিযোগগুলো সত্য হলে ব্যবস্থা নিতে এত বিলম্ব কেন? আর অভিযোগগুলো মিথ্যা হলে নিরপেক্ষ তদন্ত করে তা পরিষ্কার করা হচ্ছে না কেন?
সাংবাদিকদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, ভূমি অফিসের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিকদের বিভিন্নভাবে হয়রানি ও ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। এমনকি স্থানীয় প্রভাবশালী আত্মীয়স্বজনের পরিচয় ব্যবহার করে সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করতে বলা এবং সংবাদ না সরালে মামলা ও হামলার ভয় দেখানোর অভিযোগও উঠেছে।
এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু একজন ভূমি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; বরং সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহ ও জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশের অধিকার নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
‘ক্ষমতার উৎস’ কোথায়—জানতে চায় সাধারণ মানুষ
এত অভিযোগের পরও যদি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত বা দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপ না হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—তার ক্ষমতার উৎস কোথায়? কার প্রভাব বা আশ্রয়ে তিনি এত অভিযোগের পরও একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন?
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগ অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি—দুই ক্ষেত্রেই স্বচ্ছ তদন্তের বিকল্প নেই।
ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি
কাউলীবেড়া ইউনিয়নের ভূমি সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের দাবি, পুরোনো দলিল, খতিয়ান, মাঠ রেকর্ড, নামজারি মামলা ও সংশ্লিষ্ট আদেশপত্র যাচাই করে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক।
বিশেষ করে ২১ শতাংশ জমি ক্রয়ের পর অতিরিক্ত ২১ শতাংশ নামজারির আশ্বাসের অভিযোগ, এক দাগের জমি অন্য দাগের খতিয়ানে নামজারির অভিযোগ এবং মাঠ রেকর্ডভুক্ত জমি পুনরায় নামজারি সংক্রান্ত অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা জনগণের সামনে তুলে ধরার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
এ বিষয়ে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা সালমা আক্তারের বক্তব্য নেওয়া গেলে তা প্রতিবেদনের পরবর্তী সংস্করণে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এসিল্যান্ড, উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসন ও ভূমি সেটেলমেন্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রশ্ন একটাই—অভিযোগগুলো কি সত্য, নাকি মিথ্যা? নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই এর উত্তর বেরিয়ে আসবে।