
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোটে না ফেরার সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় নির্বাচনের শুরুতেই বড় ধাক্কায় পড়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় ঐক্য। তবে এই হোঁচট কাটিয়ে ভোটের মাঠে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে নতুন করে কৌশল সাজাচ্ছে জামায়াত। ইসলামপন্থিদের ভোট টানতে দলটি এখন প্রচার ও সমীকরণে পরিবর্তনের পথ খুঁজছে। নেতাদের দাবি, হেফাজতকেন্দ্রিক কয়েকটি দল থাকায় ভোটের মাঠে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। এ ছাড়া ক্ষমতাকেন্দ্রিক সমীকরণে বেশিরভাগ ইসলামী দলগুলো যেখানে সেই জোটেই ভোট দেওয়া অধিকতর লাভজনক বিষয়টিও ব্যাপকভাবে তুলে ধরার কৌশল নিচ্ছে দলটি।
আলাদা নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের সঙ্গে জামায়াতসহ জোটের কয়েকটি দলের শীর্ষনেতারা যোগাযোগ করেন। তারা সার্বজনীন স্বার্থে জোটে ফিরে আসার অনুরোধ জানান। কিন্তু এতে সায় দেননি চরমোনাই পীর। তার ভাষ্য সংবাদ সম্মেলনে সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর পর তা বদল করার সুযোগ নেই।
গত শুক্রবার ইসলামী আন্দোলন জামায়াতের ১১ দলীয় জোটে না থেকে ২৬৮ আসনে দলীয় প্রার্থীদের এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে। ওই দিনের সংবাদ সম্মেলনে দলের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেছিলেন, ওয়ান বক্স পলিসির মাধ্যমে ইসলামপন্থি শক্তি এক করার যে চেষ্টা ছিল, সেটি নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলেই নিজেদের মতো নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসলামী আন্দোলন।
জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেওয়া সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান সময়ের আলোকে বলেন, ২৬৮টি আসনে যে দল এককভাবে প্রার্থী ঘোষণা করতে পারে, তারা নিঃসন্দেহে বড় দল। আমি মনে করি ইতিমধ্যে ইসলামী আন্দোলন বৃহৎ দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তাদের রাখা যেতে পারলে জোট শক্তিশালী হতো। তিনি বলেন, ইসলামী আন্দোলন চলে যাওয়ায় ভোটের মাঠে জোটের প্রভাব তো পড়বেই। তবে তা জামায়াতেই ইসলামী ওভারকাম করতে পারবে। কেননা জামায়াতকে নতুনভাবে প্রমাণ করতে হবে না যে তারা ইসলামি দল। যে কারণে চরমোনাই পীরকে মানুষ ভালোবাসেন, একই কারণে জামায়াত আমিরকেও মানুষ ভালোবাসেন। জামায়াত চাঁদাবাদ ও দুর্নীতিমুক্ত সমতার বাংলাদেশ গড়তে চায়। তারা নিশ্চয়ই জোটের এই হোঁচট কাটিয়ে উঠতে পারবে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। ভোটের রাজনীতিতে জামায়াত তার প্রমাণ রাখবে বলে মনে হচ্ছে। ইসলামপন্থিদের ভোট এক বাক্সে আনার চেষ্টা করবে জামায়াতে ইসলামী।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের এক নেতা সময়ের আলোকে বলেন, এটি সত্য চরমোনাই পীর সাহেবের অনেক অনুসারী রয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গে তাদের ভোট আছে উল্লেখ করার মতো। জোটে থাকলে এই সুবিধাটা পাওয়া যেত। এখন বিএনপির অবস্থান অটো আরও পাকাপোক্ত হলো। তবে এই নেতা মনে করেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের কথায় কওমি মাদরাসার অনেক ভোট জামায়াতের দিকে আনার চেষ্টা করবেন তিনি। কওমি অঙ্গনে তার একটি জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্য আছে। পারিবারিক ঐতিহ্যও আছে।
ইসলামপন্থিদের ভোট এক বাক্সে আনার চেষ্টা কিছুটা ব্যাহত হবে বলে মনে করেন খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, ইসলামী আন্দোলন চলে যাওয়ায় জোট ক্ষতিগ্রস্ত তো হয়েছেই; এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে এই হোঁচট আমরা নিজেরা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করব। ইসলামী আন্দোলন আর ফিরবে না। আমি নিজে চরমোনাই পীরের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি নেতিবাচক জবাব দিয়েছেন। যেহেতু তারা সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন, সে জন্য জোটে ফেরার আর সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন। এখন ফাঁকা আসনগুলো আলোচনার মাধ্যমে ১০ দলের মধ্যে ভাগাভাগি হবে।
জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা এখনও ‘এক বাক্স নীতিতে’ আছে এবং দলটি মনে করছে ‘ইসলামপন্থিদের ভোট এক বাক্সে’ আনার সময় এখনও শেষ হয়ে যায়নি। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সময়ের আলোকে বলেন, রাজনীতির শেষ কথা বলে কিছু নেই। অনেক কিছুই ঘটে শেষ বেলায়। আমরা অপেক্ষা করছি ইসলামী আন্দোলন জোটে ফিরবে।
এদিকে ইসলামী আন্দোলন এককভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দিলেও তাদের জোটে ফিরে আসার সুযোগ থাকার কথা জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। এককভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে ইসলামী আন্দোলনের সংবাদ সম্মেলনের পরদিন শনিবার ঢাকার মগবাজারে দলীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা জানান তিনি। ইসলামী আন্দোলনের জন্য জামায়াতের দরজা এখনও খোলা রয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সবার জন্য জামায়াতের দরজা খোলা আছে।
আর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জন্য ৪৭টি আসন রেখেছিল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট; কিন্তু দলটি জোটে না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওই আসনগুলো এখন জোটের দলগুলোর মধ্যে ভাগাভাগি হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক।
বিশেষ বৈঠক জামায়াতের : এদিকে জোট নিয়ে হোঁচট খাওয়ার পর নিজেদের মধ্যে বিশেষ বৈঠক করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বিশেষ বৈঠক মগবাজারস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, দলের নির্বাচনি ইশতেহার, পলিসি পেপার, ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা, সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হয়।
এ ছাড়া নির্বাচন উপলক্ষে প্রচার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আগামী ২২ জানুয়ারি ঢাকায়, ২৩ ও ২৪ জানুয়ারি উত্তরবঙ্গসহ সারা দেশে আমিরে জামায়াতের সফরসূচি চূড়ান্ত করা হয়।
বৈঠকটি সকাল ৯টায় শুরু হয়ে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত চলে। বৈঠকে নায়েবে আমিরবৃন্দ, সেক্রেটারি জেনারেল, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলবৃন্দ এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন বিষয়ের কয়েকজন বিশেষজ্ঞ এবং জামায়াতের কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগের দায়িত্বশীলবৃন্দ।