
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে এক অভূতপূর্ব ইতিহাস রচিত হয়েছে। মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচনে জয়লাভ করে মার্কিন ইতিহাসের প্রথম মুসলিম হিসেবে সিনেটে জায়গা করে নিয়েছেন প্রগতিশীল ডেমোক্রেটিক নেতা আবদুল আল সাঈদ। তবে এই বিজয় কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক জয় নয়; বরং এটি ছিল বর্ণবাদ, ইসলামোফোবিয়া এবং লাখো ডলারের লবিংয়ের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অধিকার ও মর্যাদার এক বিশাল লড়াই।
নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই আবদুল আল সাঈদকে তাঁর মুসলিম পরিচয় এবং আরব বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণে নানা ধরনের টার্গেটেড হামলার শিকার হতে হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী তাঁকে ঘিরে বিভিন্ন নেতিবাচক প্রোপাগান্ডা ও বর্ণবাদী মন্তব্য ছড়ায় এবং শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাঁকে হেয় প্রতিপন্ন করার সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা চালায়। এর পাশাপাশি, তাঁর এই অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে প্রভাবশালী ইসরায়েলপন্থী লবিং গ্রুপ AIPAC প্রায় ৩০ থেকে ৪২ মিলিয়ন ডলারের রেকর্ড পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল যেকোনো মূল্যে তাঁকে পরাজিত করে মূলধারার রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখা।
প্রচারণার সময় তিনি খুব স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, আমেরিকানদের দেওয়া ট্যাক্সের টাকা কোনো কারণ ছাড়া যুদ্ধে বা বিদেশি সংহারের পিছে ব্যয় না করে, বরং সেই টাকা দেশের মেডিকেল সেক্টর, শিক্ষার্থীদের উন্নয়ন এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় করা উচিত। তিনি আরও বলেন যে, ইসরায়েল তাঁদের কোনো অপরিহার্য মিত্র নয় এবং মিত্র হিসেবে দেশকে সংকটে ফেলে এমন সাহায্য দেওয়া চলে না; বরং আমেরিকার সাধারণ মানুষের কল্যাণকাজেই প্রধান অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার।
এতসব বাধা, বর্ণবাদী আক্রমণ এবং বিশাল আর্থিক প্রতিপক্ষকে পেছনে ফেলে আবদুল আল সাঈদ দুর্দান্ত জয় ছিনিয়ে নেন। এবারের নির্বাচনে তিনি প্রায় ২,৪৯৭,৮৫৮টি ভোট (প্রায় ৫২.৫%) পেয়ে বিজয়ী হন, যেখানে তাঁর প্রধান প্রতিপক্ষ রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স পান প্রায় ২,১৬২,৮৯০টি ভোট (প্রায় ৪৫.৫%)। অর্থাৎ, প্রায় ৭ শতাংশ বা ৩ লক্ষ ৩৫ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে তিনি এই জয় নিশ্চিত করেন। ডেট্রয়েট শহরের স্বাস্থ্য বিভাগের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে করোনাকাল ও তাঁর পরবর্তীতে তাঁর ভূমিকা সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষা করেছিল। পাশাপাশি, কর্পোরেট স্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা বা “Medicare for All” এবং শিক্ষা নিশ্চিত করার পক্ষে তাঁর জোরালো অবস্থান তরুণ ও কর্মজীবী মানুষের মন জয় করে নেয়। বর্ণবাদী আক্রমণ ও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে হওয়া বৈষম্যের মুখেও তিনি পিছু হটেনি, বরং সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা সোচ্চারে বলে গেছেন।
নির্বাচনে জয়ের পর নিজের প্রতিক্রিয়ায় আবদুল আল সাঈদ অত্যন্ত দৃঢ় ও অনুপ্রেরণাদায়ক ভাষায় বলেন, “I’m not a politician. I’m a doctor with an 11-letter first name” (অর্থাৎ: “আমি কোনো গতানুগতিক রাজনীতিক নই, আমি ১১ অক্ষরের নামের একজন সাধারণ চিকিৎসক।”)। তিনি উল্লেখ করেন যে, সাধারণ মানুষ যেভাবে বর্ণবাদ ও সব অপপ্রচারের দেয়াল ভেঙে তাঁকে আপন করে নিয়েছে, তা আমেরিকার বহুত্ববাদী সমাজের প্রকৃত রূপ ফুটিয়ে তুলেছে। সবমিলিয়ে, আবদুল আল সাঈদের এই ঐতিহাসিক জয় প্রমাণ করেছে যে ঘৃণা, বর্ণবাদ এবং বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রভাব ছাপিয়েও নীতি, সততা এবং জনকল্যাণমুখী রাজনীতি শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়, আর তাঁর এই অর্জন বিশ্বজুড়ে নিপীড়িত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।