
মোঃ মামুন হোসেন : সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজির যে ভয়াবহ চিত্র সম্প্রতি সামনে এসেছে, তা নিছক একটি বাজার বা নির্দিষ্ট এলাকার সমস্যা নয়; বরং এটি আমাদের সামগ্রিক নগর-ব্যবস্থাপনার গভীর সংকট ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার এক নির্মম প্রতিফলন। এই চিত্র আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—কিভাবে আইনের শাসনের ফাঁক গলে অপরাধচক্রগুলো নিজেদের শক্তিশালী করে তুলছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে জিম্মি করে ফেলছে।একটি বাজারে বা শহরের কোনো ব্যস্ত এলাকায় যখন “লাইনম্যান” থেকে শুরু করে তথাকথিত “প্রধান সমন্বয়কারী” পর্যন্ত চার স্তরের একটি সুসংগঠিত চাঁদাবাজি নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে, তখন সেটি আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ থাকে না; এটি হয়ে ওঠে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেওয়া অপরাধব্যবস্থা। এই কাঠামো এমনভাবে পরিচালিত হয়, যেন এটি একটি বিকল্প প্রশাসন—যেখানে নিয়ম-কানুন, শিফট, দায়িত্ব বণ্টন—সবই সুপরিকল্পিত। তিনটি শিফটে বিভক্ত হয়ে প্রতিটি ফুটপাতের দোকান থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে, যা শুধু অনৈতিকই নয়, বরং সরাসরি আইনবিরোধী এবং মানবাধিকারের পরিপন্থী।ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা, যারা অল্প পুঁজি নিয়ে নিজেদের ও পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রতিদিন সংগ্রাম করেন, তারাই এই চাঁদাবাজির প্রধান শিকার। প্রতিদিনের আয় থেকে একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে চাঁদাবাজ চক্রের হাতে। ফলে তারা যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি মানসিকভাবেও ভেঙে পড়ছেন। তাদের জীবনে অনিশ্চয়তা, ভয় ও হতাশা ক্রমেই বাড়ছে। ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া যেন একটি যুদ্ধের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে—যেখানে প্রতিপক্ষ কোনো বৈধ প্রতিযোগী নয়,
বরং সংগঠিত অপরাধচক্র।এই চাঁদাবাজির ফলে বাজারে পণ্যের মূল্যও অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। কারণ ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত খরচের বোঝা ক্রেতাদের উপর চাপিয়ে দেন। ফলে সাধারণ ভোক্তাদেরও এর নেতিবাচক প্রভাব ভোগ করতে হয়। এভাবে একটি অপরাধচক্র শুধু ব্যবসায়ীদের নয়, পুরো নগরজীবনকেই প্রভাবিত করছে। জনজীবনের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হচ্ছে, অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং সামাজিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে।সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই চক্রগুলো এতটাই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে যে অনেক ক্ষেত্রে তারা আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে বা প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কখনো কখনো অভিযোগ ওঠে, কিছু অসাধু ব্যক্তি বা প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এই চাঁদাবাজি চলছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে সাধারণ মানুষ বিচার পাওয়ার ব্যাপারে আস্থা হারাতে বসেছে।এই অবস্থার অবসান ঘটাতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ। চাঁদাবাজ চক্রের প্রতিটি স্তরের ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে। শুধুমাত্র নিম্নস্তরের কর্মীদের গ্রেপ্তার করলেই হবে না; বরং এর পেছনে থাকা মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং প্রভাবমুক্ত।আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। নিয়মিত অভিযান, গোপন নজরদারি এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে এই চক্রগুলোর কার্যক্রম ভেঙে দিতে হবে। একইসাথে, যারা সাহস করে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অভিযোগ করবেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ অভিযোগকারীরা যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তবে কেউই সামনে আসতে চাইবেন না।স্থানীয় প্রশাসন ও সিটি কর্পোরেশনকেও এ বিষয়ে আরও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা নিতে হবে। ফুটপাত ব্যবস্থাপনা, হকারদের নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার তদারকির ক্ষেত্রে একটি স্বচ্ছ ও কার্যকর নীতি প্রণয়ন জরুরি। যেখানে প্রত্যেক ব্যবসায়ী জানবেন—তিনি কীভাবে বৈধভাবে ব্যবসা করবেন এবং কোনো অবৈধ চাপের মুখে পড়লে কোথায় অভিযোগ জানাবেন।একইসাথে, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং সচেতন জনগণের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম যদি নিরপেক্ষভাবে এসব চিত্র তুলে ধরে এবং নাগরিক সমাজ যদি সংগঠিতভাবে প্রতিবাদ গড়ে তোলে, তবে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে। নীরবতা এখানে অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়—তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়াই সময়ের দাবি।রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হলো—তার নাগরিকদের নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবিকা নিশ্চিত করা। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যেন হয়রানি ও ভয়ের বাইরে থেকে স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা সংবিধানসম্মত দায়িত্ব। কোনোভাবেই তাদের জীবন ও জীবিকা অপরাধচক্রের হাতে জিম্মি হয়ে থাকতে পারে না।আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস—যদি সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে এই চাঁদাবাজির দুষ্টচক্র ভেঙে ফেলা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু সৎ ইচ্ছা, সমন্বিত উদ্যোগ এবং নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি। অন্যায় যত শক্তিশালীই হোক, ন্যায়ের শক্তি তার চেয়ে বড়—এটাই আমাদের আশা ও প্রেরণা।নগরবাসীর পাশে থেকে, তাদের অধিকার রক্ষায় এবং একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে কাজ করে যাওয়াই আমাদের অঙ্গীকার। এখনই সময়—সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। দায়ীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের অপরাধ করার সাহস না পায়।