আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন ধ্বনিতে গতকাল প্রকম্পিত হয় টঙ্গীর তুরাগ নদের তীর। লাখো মুসল্লির অংশগ্রহণে শেষ হলো তাবলিগের প্রথম ধাপের বিশ্ব ইজতেমা। রোববার সকাল ৯টা ১১ মিনিটে আখেরি মোনাজাত শুরু হয়ে শেষ হয় ৯টা ৩৫ মিনিটে। মোনাজাত পরিচালনা করেন মাওলানা জুবায়ের। মোনাজাতে অংশ নিয়েছেন রাজধানী ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকাসহ দূরদূরান্তের লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মানুষ। শনিবার রাত ও রোববার ভোর থেকেই মুসল্লিরা দলে দলে জড়ো হতে থাকেন টঙ্গীর ইজতেমা মাঠে। রাতের মধ্যেই পুরো মাঠ ভরে যাওয়ায় জায়গা না পেয়ে হাজার হাজার মানুষ অবস্থান নেন সড়ক ও আশপাশের গলিতে।
এ সময় আশপাশের শাখা সড়কেও বন্ধ হয়ে যায় যানবাহন চলাচল। মুসল্লিদের পদচারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উত্তরা হাউস বিল্ডিং থেকে গাজীপুর, টঙ্গী-ঘোড়াশাল আঞ্চলিক সড়কের টঙ্গী স্টেশন রোড থেকে আমতলী, আবদুল্লাহপুর আশুলিয়া সড়কের বেড়িবাঁধ পর্যন্ত লাখো মানুষের সমাগম। এ ছাড়া তুরাগ নদীর পাড়ে, ভিড়ানো নৌকা, আশপাশের দোকানপাট, বিভিন্ন মিল কারখানা ছাদে ছিল মানুষ আর মানুষ। অনেকে আবার খবরের কাগজ, জায়নামাজ, পলিথিন বিছিয়ে বসে পড়েছিলেন যে যেখানে পেরেছেন সেখানে। মোনাজাতে প্রথম ২১ মিনিটব্যাপী মাওলানা জুবায়ের পবিত্র কুরআনে বর্ণিত দোয়ার আয়াতগুলো উচ্চারণ করেন। পরে ১২ মিনিট বাংলা ভাষায় মোনাজাত করেন।
মোনাজাতে তিনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান, মঙ্গল কামনা করেন দেশ, জাতি ও মানবতার জন্য। এ সময় মুসল্লিদের আমিন আমিন ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে তুরাগ তীরসহ আশপাশের এলাকা। এর আগে ফজরের নামাজের পর ভারতের মাওলানা আবদুর রহমানের হেদায়েতি বয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তৃতীয় দিন বা শেষ দিনের ইজতেমা। নসিহতমূলক বয়ান ভারতের মাওলানা ইব্রাহিম দেওলা।
সরেজমিন দেখা যায়, সকাল থেকে টঙ্গীর তুরাগ তীরে এগিয়ে চলেছে মানুষের ঢল। যত দূর চোখ যায়, শুধু মানুষ আর মানুষ। সড়ক, মহাসড়ক, খোলা জায়গা, ঘরবাড়ির ছাদ, সড়কে থেমে থাকা বাস, ট্রাক বা পিকআপ ভ্যানের ওপরেও মানুষ। কেউ বসে আছেন, কেউ দাঁড়িয়ে কান পেতে আছেন মাইকের দিকে।
১০ কিলোমিটার হেঁটে এসেছেন মুসল্লিরা : কুয়াশায় আচ্ছন্ন শীত উপেক্ষা করে লাখো মানুষ আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে আসেন। যান চলাচল বন্ধ থাকায় অনেকে ১০ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে তুরাগ তীরে ইজতেমা ময়দানে আসেন। ফজরের নামাজের পর থেকেই ময়দানমুখী হোন টঙ্গীর আশপাশের এলাকার মুসল্লিরা। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে মুসল্লিদের ঢল নেমেছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মহাসড়কে মুসল্লিদের স্রোত বাড়তে থাকে। গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাস থেকে ইজতেমা মাঠের দূরত্ব ১০ কিলোমিটার। যার পুরোটায় পায়ে হেঁটে এসেছেন হাজারো মুসল্লি।
হুড়োহুড়িতে আহত শতাধিক : মোনাজাত চলাকালে তখন সকাল ৯টা ৩৩ মিনিট। লাখো মুসল্লি মোনাজাতে ব্যস্ত। হঠাৎ বিকট শব্দ কিছু বুঝে ওঠার আগেই আতঙ্কে মুসল্লিরা হুড়োহুড়ি শুরু করেন। এ সময় পড়ে গিয়ে ও পদদলিত হয়ে ৪১ মুসল্লি আহত হন। টঙ্গীর স্টেশন রোড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন বলেন, টঙ্গীর স্টেশন রোড এলাকায় মুসল্লিরা মোনাজাতে ছিলেন। এ সময় সেখানকার আবেদা হাসপাতালের সামনে কয়েকটি গ্যাস বেলুন নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক ব্যক্তি। সেখানে কেউ একজন ড্রোন উড়িয়ে মোনাজাতের ছবি ও ভিডিও ধারণ করছিলেন। এর মধ্যে হঠাৎ ড্রোনটি গিয়ে বেলুনে আঘাত করলে দুই থেকে তিনটি বেলুন ফেটে বিকট শব্দ হয়। পরে হুড়োহুড়িতে মুসল্লিরা আহত হন।
অপরদিকে, ইজতেমায় আখেরি মোনাজাত চলার সময় সকাল ৯টা ২৫ মিনিটের দিকে ইজতেমা ময়দানের ২নং গেটের সামনে ব্যাটারি বিস্ফোরিত হয়ে বিকট শব্দে ড্রোন মাটিতে পড়ে। এতে মুসল্লিরা আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি করতে থাকেন। এ ঘটনায় ৬৪ জন মুসল্লি আহত হয়।
জানা গেছে, তাবলিগ জামাতের মাওলানা মোহাম্মদ জুবায়ের বিশ্ব ইজতেমার আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করছিলেন। মোনাজাতের শেষের দিকে কয়েক মিনিট আগে ইজতেমা ময়দানের ২নং গেটের একটু সামনে মোনাজাতের চিত্র ধারণ করার কাজে ব্যবহার করা একটি ড্রোন আছড়ে পড়ে। এ সময় বিকট শব্দের সৃষ্টি হয়। এতে আতঙ্কিত হয়ে ওই স্থানে থাকা মুসল্লিরা ছোটাছুটি করতে থাকেন।
টঙ্গী আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের নার্স মোস্তাফিজুর রহমান জানান, শতাধিক মুসল্লি আহত হয়ে হাসপাতালে এসেছেন। তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
টঙ্গী পূর্ব থানার ওসি ফরিদুল ইসলাম বলেন, একটি ড্রোন আকাশে উড়ছিল, সম্ভবত ড্রোনটির চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ায় সেটি ২নং গেটের একটু সামনের এলাকায় আছড়ে পড়ে। এতে মুসল্লিরা অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।
গরম পানিতে ঝলসে আহত ৪ : বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে গরম পানিতে ঝলসে আহত হয়েছেন চার মুসল্লি। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত একজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বেলা পৌনে ১১টায় আখেরি মোনাজাত শেষে ময়দান থেকে একসঙ্গে বহু মুসল্লি বের হওয়ার সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে। টঙ্গী পশ্চিম থানার ওসি ফরিদ হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
আহত মুসল্লিরা হলেন, বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার অলিদা বাগান গ্রামের আমজাদ সরকারের ছেলে জুয়েল (২৫), নাটোরের ফজলুর রহমানের ছেলে সোহেল (৩০), ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার জাবেদ আলীর ছেলে ফজল হক (৩৪), জামালপুরের আব্বাস আলী সরকারের ছেলে মোজাফফর আলী সরকার (৪৪)। তাদের টঙ্গীর শহিদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আখেরি মোনাজাতের শেষে মুসল্লিরা ময়দান থেকে বের হওয়ার সময় অসাবধানতাবশত ইজতেমার ৪নং গেটের ভেতরে চায়ের কেটলির গরম পানি পড়ে যায়। এ সময় পানি ছিটকে চার মুসল্লি আহত হন। তাদের মধ্যে জুয়েলের ডান পায়ে চায়ের কেটলি পড়ে হাঁটুর নিচের অংশ ঝলসে যায়।
ট্রেনে ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন মুসল্লিরা : মোনাজাত শেষে একযোগে মুসল্লিরা বাড়ি ফিরতে শুরু করায় নির্ধারিত ট্রেনে দেখা যায় উপচেপড়া ভিড়। বাস, ট্রেনসহ বিভিন্ন যানবাহনে গন্তব্যে পাড়ি দিয়েছেন তারা। মুসল্লিদের সুবিধার্থে বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করে প্রশাসন। তবে লাখো মুসল্লির তুলনায় অপ্রতুল যানবাহন থাকায় অনেকে ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনসহ বিভিন্ন যানবাহনে যেতে দেখা যায়।
বর্ধিত যাত্রী পরিবহনের জন্য বিশেষ ট্রেন পরিচালনার পাশাপাশি এক্সপ্রেস, কমিউটার এবং লোকাল ট্রেনগুলোতে অতিরিক্ত বগি সংযোজন করা হয়। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি আন্তঃনগর ট্রেন টঙ্গী রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রাবিরতি করে। নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ট্রেনের ছাদ, ইঞ্জিনের সামনের অংশে চড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
অপরদিকে সড়কপথে ট্রাক, পিকআপ ও অটোরিকশায় গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে মুসল্লিদের। সার্বিক ব্যবস্থাপনা ভালো থাকায় সড়ক পথে তেমন ভোগান্তি হয়নি। আজ সোমবার শুরু হবে দ্বিতীয় ধাপের ইজতেমা, চলবে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। আর ১৪ থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি মাওলানা সাদের অনুসারীদের ইজতেমা পালনের কথা।