
হাসান জামিল: একজন মানুষকে চেনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আয়না তাঁর পদ-পদবি নয়, তাঁর কাজ। পরিচয়ের আড়ম্বর কিংবা সামাজিক দৃশ্যমানতা দিয়ে মানুষের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা যায় না; বরং মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানো, সমাজের প্রয়োজনকে অনুভব করা এবং নিজের সামর্থ্যকে অন্যের কল্যাণে কাজে লাগানোর মধ্যেই একজন মানুষের আসল পরিচয় প্রকাশ পায়। সেই অর্থে মোঃ মামুন হোসেনকে শুধু কবি, লেখক, সাংবাদিক কিংবা সংগঠক হিসেবে দেখলে তাঁর কর্মপরিসরের একটি অংশই দেখা হবে। শিক্ষা, সাহিত্য, সমাজসেবা ও মানবিক মূল্যবোধ—এই চারটি ধারাকে একসূত্রে গাঁথার চেষ্টা তাঁর পথচলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
সাহিত্য তাঁর চিন্তার ভাষা, শিক্ষা তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র এবং মানুষের কল্যাণ তাঁর কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রেরণা। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর যে উদ্যোগ তিনি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এগিয়ে নিচ্ছেন, তা স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক দায়িত্ববোধের একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীর হাতে বই-খাতা তুলে দেওয়া কিংবা শিক্ষার পথে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা আপাতদৃষ্টিতে ছোট উদ্যোগ মনে হতে পারে; কিন্তু একটি শিশুর শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে এমন সহযোগিতার মূল্য অনেক বড়।কারণ শিক্ষা শুধু একটি সনদ অর্জনের নাম নয়; শিক্ষা মানুষের চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করে, আত্মমর্যাদা তৈরি করে এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের সক্ষমতা বাড়ায়। যে সমাজ তার শিশু-কিশোরদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে চায়, সেই সমাজই দীর্ঘমেয়াদে মানবিক ও টেকসই ভবিষ্যতের ভিত গড়ে। এই জায়গা থেকেই মামুন হোসেনের শিক্ষানুরাগী কর্মকাণ্ডের তাৎপর্য বিবেচনা করা যায়।তাঁর সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রেও মানুষের জীবন ও সমাজের বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সময়ের পরিবর্তন, সম্পর্কের টানাপোড়েন, সামাজিক সংকট, মূল্যবোধের অবক্ষয়, মানুষের অন্তর্গত অনুভূতি এবং চারপাশের পরিবর্তিত জীবন তাঁর লেখার নানা অনুষঙ্গ। তাঁর কাছে সাহিত্য কেবল শব্দের সৌন্দর্য নির্মাণের বিষয় নয়; সাহিত্য মানুষের জীবনকে দেখার, সময়কে বোঝার এবং সমাজের নানা প্রশ্নকে সামনে আনার একটি মাধ্যম।
একজন কবির কলম যখন মানুষের আনন্দ-বেদনার সঙ্গে যুক্ত হয়, একজন প্রাবন্ধিক যখন সামাজিক অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন তাঁর লেখালেখি ব্যক্তিগত অনুভূতির সীমা অতিক্রম করে বৃহত্তর সামাজিক পরিসরে প্রবেশ করে। মামুন হোসেনের সাহিত্যিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে এই সংযোগটি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তাঁর লেখার মানুষ এবং তাঁর সামাজিক কর্মকাণ্ডের মানুষ—দুই সত্তার মধ্যে একটি অভিন্ন জায়গা আছে: মানবিকতা।বর্তমান সময়ে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতি, ইতিহাস ও শেকড়ের দূরত্বও দ্রুত বাড়ছে। নগরায়ণ ও পরিবর্তিত জীবনযাত্রার ভেতর অনেক স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও স্মৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। একটি নদী, একটি মাঠ, একটি পুরোনো স্থাপনা, একটি গ্রামের পথ কিংবা কোনো প্রবীণ মানুষের স্মৃতিও যে একটি জনপদের ইতিহাসের অংশ—এই উপলব্ধি নতুন প্রজন্মের মধ্যে তৈরি করা জরুরি। কারণ শেকড় সম্পর্কে সচেতনতা ছাড়া ভবিষ্যৎ নির্মাণও অনেক সময় অসম্পূর্ণ থেকে যায়।সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি ইতিহাস, ঐতিহ্য, পরিবেশ ও স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সচেতনতা তৈরি করার যে প্রয়োজনীয়তা মামুন হোসেন তাঁর লেখায় ও কর্মকাণ্ডে তুলে ধরেন, তা বৃহত্তর সামাজিক ভাবনার সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি কেবল অতীতকে স্মরণ করার বিষয় নয়; বরং বর্তমানকে বুঝে ভবিষ্যৎকে আরও দায়িত্বশীলভাবে নির্মাণের একটি পথ।নারায়ণগঞ্জের সাহিত্যাঙ্গনেও তাঁর সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা উল্লেখযোগ্য। সাহিত্য সংগঠনের কাজ শুধু সভা-সেমিনার বা প্রকাশনা অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তার সামাজিক প্রভাব সীমিত হয়ে পড়ে। একটি কার্যকর সাহিত্য সংগঠনের দায়িত্ব হলো লেখক-পাঠকের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করা, নবীন প্রতিভাকে উৎসাহ দেওয়া এবং মুক্ত ও সুস্থ সাহিত্যচর্চার পরিবেশ গড়ে তোলা। নারায়ণগঞ্জ জেলা সাহিত্য ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা হিসেবে তাঁর সম্পৃক্ততা সেই বৃহত্তর সাংগঠনিক ধারার সঙ্গে যুক্ত।নারায়ণগঞ্জে বহু প্রতিভাবান কবি, লেখক ও সাহিত্যকর্মী রয়েছেন। তাঁদের অনেকের প্রয়োজন শুধু একটি সুযোগ, কিছু উৎসাহ এবং নিজেদের সৃষ্টিশীলতা প্রকাশের একটি সহায়ক পরিবেশ। অভিজ্ঞদের সঙ্গে নবীনদের সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারলে সাহিত্যচর্চা আরও প্রাণবন্ত হয়। এই জায়গায় সাংগঠনিক ভূমিকা ব্যক্তিগত পরিচয়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আজকের সমাজ নানা সংকটে আক্রান্ত—শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া, মাদক, কিশোর অপরাধ, সামাজিক বিভাজন, অসহিষ্ণুতা, মূল্যবোধের সংকট এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস তারই কিছু প্রকাশ। এসব সমস্যার সমাধান শুধু রাষ্ট্র বা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী এবং সচেতন নাগরিক—প্রত্যেকের দায়িত্ব রয়েছে।এই বাস্তবতায় একজন সাহিত্যিকের কলম যেমন মানুষের বিবেককে নাড়া দিতে পারে, একজন সমাজকর্মীর উদ্যোগ মানুষকে সংগঠিত করতে পারে, তেমনি একজন শিক্ষানুরাগীর সামান্য সহযোগিতাও একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে এগিয়ে নিতে পারে। মামুন হোসেনের কর্মকাণ্ডকে তাই কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের তালিকা হিসেবে না দেখে শিক্ষা, সাহিত্য ও মানবিক সমাজ নির্মাণের বৃহত্তর প্রয়াসের অংশ হিসেবে দেখা যায়।তবে পথচলা কখনো শেষ হয়ে যায় না। প্রতিটি অর্জনের সঙ্গে নতুন দায়িত্বও যুক্ত হয়। সামনে তাঁর জন্য আরও বড় পরিসরে কাজ করার সুযোগ রয়েছে—বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের কল্যাণ, নবীন সাহিত্যিকদের বিকাশ, পরিবেশ সচেতনতা, স্থানীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং মানবিক মূল্যবোধকে সামাজিক চর্চায় আরও বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে।সাহিত্য যদি মানুষের কথা বলে, শিক্ষা যদি ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে এবং সমাজসেবা যদি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নাম হয়—তবে এই তিনটি ধারার সমন্বয় একটি মানুষের পথচলাকে অর্থবহ করে তোলে। মোঃ মামুন হোসেন সেই সমন্বয়ের পথেই এগিয়ে চলেছেন।তাঁর হাতে কলম আছে, আছে মানুষের জন্য কিছু করার আকাঙ্ক্ষা। তাই তাঁর পরিচয় শুধু একজন কবি বা লেখকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি শব্দের ভেতর মানুষকে খুঁজে ফেরেন, আর মানুষের ভেতর খুঁজে ফেরেন একটি সুন্দর সমাজের সম্ভাবনা।
এই পথচলা আরও বিস্তৃত হোক। সাহিত্য হোক তাঁর চিন্তার ভাষা, শিক্ষা হোক সামাজিক অঙ্গীকার, আর মানবিকতা হয়ে উঠুক তাঁর সবচেয়ে স্থায়ী পরিচয়।