বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪৩ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম ::
রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রের দুর্নীতির চক্রে রাষ্ট্রের ক্ষয় আওয়ামী লীগের নৈরাজ্যের প্রতিবাদে বন্দরে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনৈতিক আবদার না মেটানোয় ভূমি কর্মকর্তা দুলালের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ টঙ্গিবাড়ীতে মহিলা দলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী বহুতল ভবন হিসেবে নতুন রূপে ফিরবে জিয়া হল: এমপি কালাম কুমির আতঙ্কে দিন পার করছেন বন্দরের তিনগাঁওবাসী, উদ্ধারে চলছে তৎপরতা বন্দরে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে টুটুল হত্যা, গ্রেপ্তার তাফসীর স্বাধীন রাষ্ট্র, পরাধীন মানুষ—বাস্তবতার নির্মম প্রতিচ্ছবি ভাঙ্গায় নামজারি নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ, বিক্রি হয়ে যাওয়া জমিতেও ‘কাল্পনিক নামজারি’

রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রের দুর্নীতির চক্রে রাষ্ট্রের ক্ষয়

  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১.২৭ পিএম
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

মোঃ মামুন হোসেন: দুর্নীতি যখন বিচ্ছিন্ন অনিয়মের সীমা অতিক্রম করে ক্ষমতা, প্রশাসন ও অর্থনৈতিক স্বার্থের পারস্পরিক নির্ভরতায় পরিণত হয়, তখন তার অভিঘাত কোনো একটি প্রতিষ্ঠান বা সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের সক্ষমতা, আইনের শাসন এবং নাগরিকের আস্থা। বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার সামনে দুর্নীতি মোকাবিলার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাই শুধু দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি শনাক্ত করা নয়; বরং দুর্নীতির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে এমন সম্পর্ক ও কাঠামো ভেঙে দেওয়া।এই বাস্তবতায় তিনটি পক্ষ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—রাজনৈতিক ক্ষমতার বলয়, প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র এবং ঠিকাদার-ব্যবসায়ী বা সংশ্লিষ্ট স্বার্থগোষ্ঠী। অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে সব রাজনীতিবিদ, সব সরকারি কর্মকর্তা বা সব ব্যবসায়ী দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। বরং সমস্যা হলো, ব্যবস্থার দুর্বলতা যখন অসাধু ব্যক্তিদের পারস্পরিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
চক্রটির শুরু হতে পারে রাজনৈতিক প্রভাব দিয়ে। কোনো প্রকল্প, নিয়োগ, অনুমোদন বা সরকারি সিদ্ধান্তে অযাচিত প্রভাব বিস্তার করা হলে প্রশাসনিক পর্যায়ে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়। এরপর ঠিকাদার বা ব্যবসায়িক স্বার্থগোষ্ঠী সেই সুযোগ থেকে আর্থিক সুবিধা নেয়। বিনিময়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবশালী অংশ সুবিধা পেতে পারে—অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সুরক্ষাও তৈরি হতে পারে। এভাবেই একটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে আরেকটি স্বার্থ যুক্ত হয় এবং দুর্নীতি ব্যক্তিগত অপরাধ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকিতে রূপ নেয়।সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এই চক্রের ক্ষতি সব সময় সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হয় না। একটি প্রকল্পের ব্যয় বাড়ল, কাজের মেয়াদ বাড়ল, নিম্নমানের নির্মাণ হলো—ফাইলের ভাষায় এগুলো হয়তো প্রশাসনিক বিষয়। কিন্তু নাগরিকের কাছে এর অর্থ অনেক বেশি বাস্তব: অতিরিক্ত যানজট, জলাবদ্ধতা, ভাঙা রাস্তা, কর্মঘণ্টার অপচয় কিংবা সরকারি সেবার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা।একটি রাস্তা নির্ধারিত সময়ে নির্মাণ শেষ না হলে ব্যবসায়ীর পরিবহন ব্যয় বাড়ে, শিক্ষার্থীর যাতায়াতে সময় নষ্ট হয়, রোগীর হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হতে পারে। নিম্নমানের অবকাঠামো দ্রুত নষ্ট হলে একই কাজের জন্য আবার সরকারি অর্থ ব্যয় করতে হয়। অর্থাৎ দুর্নীতির বোঝা একবার করের মাধ্যমে এবং পরে ভোগান্তির মাধ্যমে নাগরিকের ওপর পড়ে।সরকারি সেবার ক্ষেত্রে ক্ষতিটা আরও ব্যক্তিগত। একজন নাগরিকের বৈধ কাজ যদি অকারণে আটকে থাকে এবং তা এগিয়ে নিতে অনৈতিক অর্থ দেওয়ার চাপ তৈরি হয়, তবে তার কাছে রাষ্ট্রের ধারণাই বদলে যায়। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এ ধরনের অর্থনৈতিক চাপ গুরুতর। একটি সামান্য অঙ্কও তার দৈনন্দিন খাদ্য, শিক্ষা বা চিকিৎসা ব্যয়ে প্রভাব ফেলতে পারে।এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অর্থ অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা নয়। অভিযোগের তদন্ত, প্রমাণের যাচাই এবং আদালতের মাধ্যমে ন্যায়সংগত বিচার—প্রতিটি ধাপের নিজস্ব গুরুত্ব আছে। একইভাবে দুর্নীতির অভিযোগকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার হাতিয়ার বানানোও জবাবদিহিতার উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত ব্যক্তিবিশেষকে নয়, আইন ও প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা।এই কারণেই দুর্নীতি মোকাবিলায় শুধু শাস্তির ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, প্রকল্পের তথ্য প্রকাশ, স্বাধীন নিরীক্ষা, স্বার্থের সংঘাত নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের নথিভুক্তি এবং অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার—এসব একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। যেখানে সিদ্ধান্তের তথ্য নাগরিকের নাগালের বাইরে, সেখানে অনিয়ম শনাক্ত করা কঠিন। বিপরীতে তথ্য উন্মুক্ত থাকলে গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরভাবে নজরদারি করতে পারে।বাংলাদেশে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় ই-জিপির মতো ডিজিটাল ব্যবস্থা স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু প্রযুক্তি নিজে দুর্নীতি দূর করে না। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি দরপত্রের প্রকৃত প্রতিযোগিতা, কাজের মান যাচাই এবং অনিয়মের জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।প্রশাসনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাগত স্বাধীনতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি তাদের সিদ্ধান্তের জন্য জবাবদিহিতাও থাকতে হবে। পদায়ন ও পদোন্নতিতে পেশাগত যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার স্বচ্ছ মানদণ্ড না থাকলে প্রশাসনের ভেতরে অনিশ্চয়তা ও প্রভাবের সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে। আবার রাজনৈতিক নেতৃত্বের বৈধ নীতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের আইনি ও পেশাগত কাঠামোর মধ্যেই কাজ করতে হবে।রাজনৈতিক অর্থায়নও এই আলোচনার বাইরে থাকতে পারে না। রাজনীতিতে অর্থের উৎস ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা যত বেশি হবে, ক্ষমতা ও অর্থের সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহের জায়গা তত কমবে। নির্বাচনী আইন ও অর্থায়নসংক্রান্ত বিধানের কার্যকর প্রয়োগ তাই গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নাগরিকের ভূমিকাও কম নয়। তবে নাগরিককে শুধু ‘সচেতন’ হতে বললে দায়িত্ব শেষ হয় না। তাকে অভিযোগ জানানোর নিরাপদ পথ, তথ্য পাওয়ার অধিকার এবং প্রতিকার পাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা দিতে হবে। একটি সরকারি প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, কাজ শেষ হওয়ার কথা কবে, ঠিকাদার কে এবং কাজের অগ্রগতি কত—এসব তথ্য নাগরিক জানতে পারলে তিন পক্ষের সম্ভাব্য যোগসাজশের ওপর সামাজিক নজরদারি বাড়ে।
এখানেই ৯০ দিনের একটি বাস্তবধর্মী সংস্কার কর্মসূচি কার্যকর হতে পারে। প্রথম ৩০ দিনে বড় সরকারি প্রকল্পের ব্যয়, দরপত্র ও অগ্রগতির তথ্য প্রকাশ এবং উচ্চঝুঁকির প্রকল্প চিহ্নিত করা যেতে পারে। পরের ৩০ দিনে প্রশাসনিক পদায়ন, স্বার্থের সংঘাত ও রাজনৈতিক অর্থায়নের বিদ্যমান ব্যবস্থার জবাবদিহিতা পর্যালোচনা করা যেতে পারে। শেষ ৩০ দিনে অগ্রাধিকারভিত্তিক দুর্নীতির অভিযোগের অগ্রগতি প্রকাশ, প্রকল্পের মান যাচাই এবং নির্বাচিত স্থানীয় প্রকল্পে সামাজিক নিরীক্ষা চালু করা যেতে পারে।দায়িত্বও স্পষ্ট হওয়া দরকার—IMED ও সংশ্লিষ্ট ক্রয় কর্তৃপক্ষ প্রকল্প ও ক্রয়-সংক্রান্ত স্বচ্ছতায়, CAG নিরীক্ষায়, দুদক দুর্নীতির অভিযোগ ও তদন্তে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় এবং নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী অর্থায়নসংক্রান্ত বিধি প্রয়োগে নিজ নিজ ভূমিকা পালন করবে। ৯০ দিনের লক্ষ্য হবে রাতারাতি দুর্নীতি নির্মূল করা নয়; বরং কোথায় সমস্যা, কে জবাবদিহির আওতায় এবং নাগরিক কীভাবে অগ্রগতি যাচাই করবেন—তা দৃশ্যমান করা।রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ দুর্নীতির কোনো একটি ঘটনা নয়; বিপদ হলো যখন অনিয়মকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া হয়। তখন সৎ নাগরিক হতাশ হন, দক্ষ কর্মকর্তা নিরুৎসাহিত হতে পারেন, ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা বিকৃত হয় এবং জনগণের রাষ্ট্রের ওপর আস্থা কমে যায়। শেষ পর্যন্ত ক্ষতি হয় গণতন্ত্রেরও।তাই দুর্নীতির প্রশ্নে ব্যক্তি বনাম প্রতিষ্ঠান—এই সরল বিতর্কের বাইরে যেতে হবে। দেখতে হবে, রাজনৈতিক প্রভাব কোথায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে অস্বচ্ছ করছে, প্রশাসনিক ক্ষমতা কোথায় অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এবং ঠিকাদারি বা ব্যবসায়িক স্বার্থ কোথায় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার সুযোগ পাচ্ছে।রাজনীতি, আমলাতন্ত্র ও অর্থনৈতিক স্বার্থ—এই তিন বলয়ের মধ্যে জবাবদিহিতার দেয়াল যত শক্ত হবে, দুর্নীতির সুযোগ তত সংকুচিত হবে। আর সেই দেয়াল ভেঙে গেলে তার ধ্বংসাবশেষ শেষ পর্যন্ত নাগরিকের ঘরেই এসে পড়ে—কর, ভোগান্তি, অনিশ্চয়তা এবং আস্থার ক্ষয় হয়ে।রাষ্ট্রকে তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুধু কঠোর হতে হবে না; হতে হবে স্বচ্ছ, পূর্বানুমেয় ও জবাবদিহিমূলক। কারণ দুর্নীতি বন্ধের স্থায়ী উপায় শুধু দুর্নীতিবাজ খোঁজা নয়—দুর্নীতি করার সুযোগটিই কমিয়ে দেওয়া।

শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2021 rudrabarta24.net
Theme Developed BY ThemesBazar.Com

sakarya bayan escort escort adapazarı Eskişehir escort