মোঃ মামুন হোসেন : মানুষ সামাজিক প্রাণী। পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও ঐক্যের মাধ্যমে মানুষ সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করে। একটি জাতির শক্তি মূলত নির্ভর করে তার মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্মান এবং ঐক্যের ওপর। কিন্তু যখন সেই সমাজে বিভাজনের রাজনীতি প্রবেশ করে, তখন জাতির অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয় এবং সমাজে অস্থিরতা ও সংঘাত সৃষ্টি হয়। বিভাজনের রাজনীতি একটি জাতিকে দুর্বল করে দেয়, মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস সৃষ্টি করে এবং উন্নয়নের পথকে সংকুচিত করে।বিভাজনের রাজনীতি বলতে এমন একটি রাজনৈতিক বা সামাজিক কৌশলকে বোঝায়, যেখানে মানুষের মধ্যে ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, অঞ্চল, দল বা মতাদর্শের ভিত্তিতে বিভক্তি সৃষ্টি করা হয়। এই বিভক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা হয় ক্ষমতা অর্জন বা ধরে রাখার জন্য। যখন একটি সমাজে মানুষ মানুষকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন সেখানে মানবিক মূল্যবোধ ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায়। মানুষ তখন বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের পরিবর্তে ক্ষুদ্র গোষ্ঠীগত স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে।একটি জাতির উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঐক্য। ঐক্য থাকলে একটি জাতি যেকোনো সংকট মোকাবিলা করতে পারে এবং উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে। কিন্তু বিভাজনের রাজনীতি সেই ঐক্যকে ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে সমাজে সন্দেহ, ঘৃণা ও প্রতিহিংসার পরিবেশ তৈরি হয়। মানুষ তখন একে অপরকে সহযোগিতা করার পরিবর্তে বিরোধিতা করতে শুরু করে। এর ফলে সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয় এবং জাতির অগ্রগতি ব্যাহত হয়।
তাই যে কোনো বিভাজনমূলক চেতনা জাতির জন্য ক্ষতিকর। একটি সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ। বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্য, সহমর্মিতা এবং ন্যায়বিচারের চেতনা সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। যখন মানুষ নিজেদেরকে একটি বৃহত্তর জাতির অংশ হিসেবে ভাবতে শিখবে, তখনই একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠন সম্ভব হবে।অন্যদিকে, অপচেতনা বা ভুল চেতনা সমাজের জন্য আরও বড় বিপদের কারণ। যখন একটি প্রজন্মকে ভুল ধারণা, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণার মাধ্যমে প্রভাবিত করা হয়, তখন তারা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ভুল চেতনার কারণে মানুষ সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়। তখন তারা এমন কিছু ধারণা ও মতাদর্শে বিশ্বাস করতে শুরু করে, যা সমাজের জন্য ক্ষতিকর।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম যদি অপচেতনার দ্বারা প্রভাবিত হয়, তাহলে তা জাতির ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। কারণ তরুণরাই একটি জাতির আগামী দিনের নেতৃত্ব দেয়। যদি তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি, ঘৃণা ও ভুল ধারণা ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তারা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার পরিবর্তে বিভক্তি ও সংঘাতের দিকে ধাবিত হতে পারে।অপচেতনার আরেকটি বড় সমস্যা হলো এটি মানুষকে অন্ধ অনুসরণে অভ্যস্ত করে তোলে। মানুষ তখন যুক্তি, বিবেক ও সত্য যাচাই করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তারা কেবল আবেগের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে। এর ফলে সমাজে গুজব, বিদ্বেষ এবং ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা সামাজিক স্থিতিশীলতাকে আরও দুর্বল করে দেয়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সচেতনতা, শিক্ষা এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চা। সত্যভিত্তিক জ্ঞান, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে মানুষকে সঠিক পথ দেখানো সম্ভব। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সামাজিক সংগঠনগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।একটি সুস্থ ও উন্নত সমাজ গঠনের জন্য আমাদের বিভাজনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং অপচেতনার বিরুদ্ধে সচেতন হতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ধর্ম, বর্ণ বা মতাদর্শের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আমরা সবাই একই সমাজ ও একই জাতির অংশ। এই উপলব্ধিই আমাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি করবে।বিভাজনের রাজনীতি এবং অপচেতনা একটি জাতির অগ্রগতির বড় বাধা। এগুলো সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে এবং মানুষের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়। তাই একটি শক্তিশালী, মানবিক ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ গঠনের জন্য আমাদের ঐক্য, সত্য ও ন্যায়ের চেতনাকে ধারণ করতে হবে। যখন একটি জাতি বিভক্তির পরিবর্তে ঐক্যকে বেছে নেবে এবং অপচেতনার পরিবর্তে সঠিক চেতনাকে ধারণ করবে, তখনই সেই জাতি সত্যিকারের উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।