
তিন বছর বয়সী ছেলে আব্দুর রহমানকে নিয়ে চিন্তিত শহরের মাসদাইরের বাসিন্দা মা তাহমিনা তানহা। সম্প্রতি দেশব্যাপী হামের প্রকোপে উদ্বিগ্ন এই অভিভাবক সন্তানের টিকার কার্ড খুঁজে দেখেন, শেষ টিকাটি দেওয়া হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে সন্তানকে সুরক্ষিত রাখবেন এবং বাদ পড়া টিকাটি এই বয়সে দেওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে চিন্তিত তিনি।
তানহা বলেন, “খবর দেখলেই হামে মৃত্যুর সংবাদ। এক খবরে পড়লাম, টিকা দেওয়া থাকলে ঝুঁকি কম। কিন্তু টিকা কার্ড চেক করে দেখি, শেষ টিকাটি দেওয়া হয়নি। এই বয়সের বাচ্চাদের টিকাদান কেন্দ্রে টিকা দেবে কিনা বুঝতে পারছি না। আবার দেখলাম, হাম ছোঁয়াচে (সংক্রামক) রোগ। তাই টিকাদান কেন্দ্রে যেতেও ভয় লাগছে। টিকা দিতে গিয়ে যদি আক্রান্ত কোনো বাচ্চা থেকে আব্দুর রহমান আক্রান্ত হয়!”
বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া এলাকার বাসিন্দা ফাহমিদা ইমু তার সন্তানকে টিকা দিয়েছেন, তবুও উদ্বিগ্ন তিনি। ফাহমিদা ইমু বলেন, “টিকা দেওয়ার পরও অনেক বাচ্চা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। তার ওপর আমাদের বন্দরে ভালো কোনো হাসপাতাল নেই। শহরের দুই হাসপাতালেও ভালো মানের শিশু আইসিইউ নেই। আর সংবাদে দেখছি, রাজধানীর হাসপাতালগুলোতেও সিট নেই, মানুষ সিরিয়ালে থেকেও সিট বা চিকিৎসা পাচ্ছে না। এমন অবস্থায় আমার বাচ্চা আক্রান্ত হলে আমরা কোথায় যাব, কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।”
হাম ‘মিজেলস’ নামের এক অতিসংক্রামক ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট রোগ। উচ্চমাত্রার জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং জ্বরের চার দিনের মাথায় মুখ থেকে শুরু করে সারা শরীরে লালচে র্যাশের মাধ্যমে হাম প্রকাশ পায়। মিজেলস ভাইরাসটি শ্বাসনালীর মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সাময়িকভাবে দুর্বল করে দেয়। এর ফলে আক্রান্ত শিশু সহজেই নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং মস্তিষ্কের সংক্রমণ (এনসেফালাইটিস)সহ অন্যান্য জটিলতায় আক্রান্ত হতে পারে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তথ্যমতে, চলতি বছর হাম রোগে অন্তত ৪২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে মার্চ মাসেই মৃত্যু হয়েছে ৩২ শিশুর। এই তালিকায় নারায়ণগঞ্জের দুই শিশুর নামও রয়েছে। তাদের বাড়ি রূপগঞ্জ উপজেলায়। এ উপজেলায় আরও কয়েকজনের লক্ষণ দেখা দিলে তাদেরও নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, নারায়ণগঞ্জে হামের প্রভাব তুলনামূলক কম। তবে ঢাকার রূপগঞ্জের চর চনপাড়া ও মুড়াপাড়া ইউনিয়নের মাছিমপুর বারৈপাড়ায় দুই শিশুর মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে গত ২৪ মার্চ ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় দুই বছর বয়সী আরিয়ান ইসলাম রাইয়ান এবং ১৯ মার্চ ঢাকার মহাখালী উদরাময় হাসপাতালে মারা যায় এক বছর বয়সী নুহাশ।
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) এলাকায় কোনো হাম আক্রান্ত রোগী শনাক্ত না হলেও হামের টিকার চাহিদা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন নাসিকের মেডিকেল অফিসার ডা. নাফিয়া ইসলাম।
ডা. নাফিয়া ইসলাম বলেন, হাম প্রতিরোধে বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচিতে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের দুইবার ‘এমআর’ (মিজেলস-রুবেলা) টিকা দেওয়া হয়। একবার ৯ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয়বার ১৫ মাস বয়সে। তবে অনেক সময় দেখা যায়, অভিভাবকরা এই দুইটি টিকা দিতে ভুলে যান।
“সম্প্রতি হামের প্রকোপের কারণে আমাদের টিকাদান কেন্দ্রগুলোতে অনেক অভিভাবক ভিড় করছেন। বর্তমানে আমাদের কাছে পর্যাপ্ত টিকা রয়েছে। ফলে দুই বছর বয়সী শিশুদেরও আমরা টিকা দিচ্ছি। এছাড়া বড় বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে বাইরে থেকে টিকা কিনে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”
জানতে চাইলে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মুশিউর রহমান বলেন, “উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। নারায়ণগঞ্জে হামের সংক্রমণ তেমন নেই বললেই চলে। এছাড়া আমাদের কাছে পর্যাপ্ত টিকা রয়েছে এবং টিকাদান কার্যক্রম নিয়মিতভাবে চলছে।”
রূপগঞ্জে দুই শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে তিনি বলেন, “দুই শিশুর বিষয়ে আমরা অবগত। তাদের ঠিকানা অনুযায়ী আশপাশের এলাকাগুলোতে আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
কোনো শিশুর জ্বর ও শরীরে র্যাশ দেখা দিলে তা হাম হোক বা না হোক, অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান সিভিল সার্জন ডা. মুশিউর রহমান।ৃ