
নারায়ণগঞ্জ মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সাখাওয়াত ইসলাম রানার বিরুদ্ধে হত্যা ও লাশ গুমের মামলার পর অপর আরেকটি হত্যা চেষ্টার মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনি। সরকার দলের সহযোগী সংগঠনের এই দুই নেতা হত্যা ও হত্যাচেষ্টায় অভিযুক্ত হওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গণে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
গত শনিবার বিকেলে ফতুল্লা মডেল থানায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে একটি মামলা করেন স্থানীয় বিএনপি নেতা মো. হোসেন খোকা। ওই মামলায় মশিউর রহমান রনিসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাত ২০ থেকে ২৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার ফতুল্লায় একটি পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে যুবদলের দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আহত হয় খোকার ছেলে রাকিবুল হাসান রাকিব।
মামলার বাদী হোসেন খোকা এনায়েতনগর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক।
মামলায় বাদী মো. হোসেন খোকা অভিযোগ করেন, গত ৯ এপ্রিল সকালে এনায়েতনগর ইউনিয়নের হরিহরপাড়ার চাঁদনী হাউজিং এলাকায় ‘বেস্ট স্টাইল লিমিটেড’ নামে কারখানার ঝুট ক্রয়-বিক্রয় নিয়ে বিরোধে কারখানার সামনে লোকজন জড়ো হয়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দা হওয়ায় খবর পেয়ে কয়েকজনকে নিয়ে কারখানার ভেতর ঢুকতে গেলে অভিযুক্তরা তাকে মারধর করেন। তার ছেলে রাকিবুল হাসান রাকিব বাবাকে রক্ষা করতে গেলে তাকে গুলি করা হয়।
গুলিটি রাকিবের বুকের ডানপাশে লাগে এবং সে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলেও জানান খোকা।
এ মামলার ৮ নম্বর আসামি মশিউর রহমান রনিকে হামলার নির্দেশদাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে, ঘটনার দিন পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন জানিয়েছিল, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এনায়েতনগর ইউনিয়নের হরিহর পাড়ার চাঁদনী হাউজিং এলাকার ‘বেস্ট স্টাইল কম্পোজিট লিমিটেডের’ ঝুট নামাতেন জেলা যুবদলের সদস্যসচিব মশিউর রহমান রনির অনুসারীরা।
এ নিয়ে ফতুল্লা থানা যুবদলের আহ্বায়ক মাসুদুর রহমান ও তার অনুসারীদের সঙ্গে বিরোধ চলছিল। ওই বিরোধের জেরে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। গুলিতে আহত হন এক শিশুসহ তিনজন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, সংঘর্ষের সময় উভয় পক্ষ গুলি ছোড়ে, হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে স্থানীয় লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং দোকানপাট বন্ধ করে দেন ব্যবসায়ীরা।
এই ঘটনায় মামলার বাদী মো. হোসেন খোকা, তার ছেলে রাকিবুল হাসান রাকিব ও ফতুল্লা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব রাসেল মাহমুদও যুবদল নেতা মাসুদুর রহমানের পক্ষ নিয়ে সংঘর্ষে জড়ান বলেও জানিয়েছিলেন স্থানীয়রা।
তবে, সংঘর্ষের ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন যুবদল নেতা মশিউর রহমান রনি। তিনি বলেন, “সারজিল আহম্মেদ অভি তার পরিচিত এবং সে ওই পোশাক কারখানাটির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করে বৈধভাবে ঝুট ব্যবসা করছিলেন। গত ১৮ মাস যাবৎ এই ব্যবসা করলেও গত ৯ এপ্রিল মাসুদুর রহমানের নেতৃত্বে একটি পক্ষ মালামাল নামাতে বাধা দিয়ে হামলা চালায়।”
ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা না থাকলেও ‘রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে’ তাকে এ মামলায় ফাঁসানো হয়েছে বলেও দাবি রনির।
এদিকে, সংঘর্ষের ঘটনার পরদিন পেশীশক্তি প্রদর্শন, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং দলের নীতি, আদর্শ ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট অভিযোগে মাসুদুর রহমানকে বহিষ্কার করে জাতীয়তাবাদী যুবদল। তার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও নির্দেশ দেওয়া হয়।
এদিকে, গত ২৯ মার্চ ফতুল্লার ইসদাইর রেললাইন এলাকা থেকে অপহরণের শিকার হন মাহফুজুর রহমান শুভ নামে এক যুবক। পরদিন রূপগঞ্জের কাঞ্চন এলাকা থেকে মরদেহ উদ্ধার হয় তার।
গত ১ এপ্রিল শুভকে অপহরণের পর হত্যার অভিযোগে মামলা হয় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা সাখাওয়াত ইসলাম রানার বিরুদ্ধে।
নিহতের পরিবারের দাবি, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সাখাওয়াত ইসলাম রানা ও তার অনুসারীরা ওই তরুণকে অপহরণের পর হত্যা করেছে।
রানা ২০০৫ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যাওয়া যুবদলের সেই সময়ের ‘ক্যাডার’ মমিনউল্লাহ ডেভিডের ভাগনে।
নিহত ২১ বছর বয়সী মাহফুজুর রহমান শুভ ফতুল্লার পূর্ব ইসদাইর রসুলবাগের ঝুট ব্যবসায়ী মো. সোহেলের ছেলে।
১ এপ্রিল ফতুল্লা মডেল থানায় শুভর অপহরণের অভিযোগে মামলা রেকর্ড করা হয়। ওই মামলায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা সাখাওয়াত ইসলাম রানাকে প্রধান আসামি করে আরও ১০ জনকে আসামি করেন শুভর মা মাকসুদা বেগম।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, ২৯ মার্চ সন্ধ্যায় ইসদাইর রেললাইন এলাকা থেকে অপহরণের শিকার হয় তার বড় ছেলে শুভ।
মারধরের পর শুভকে একটি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকে তোলা হয়। ওই ইজিবাইকের পেছনে পেছনে শুভর মোটরসাইকেলটিও চালিয়ে যান রানা। এরপর শুভ কিংবা তার মোটরসাইকেলটির সন্ধান পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনার ১৫ থেকে ২০ দিন আগে চাষাঢ়া রেললাইন এলাকায় সাখাওয়াত ইসলাম রানার সঙ্গে তর্ক হয় শুভর। এরপর থেকে রানা ও তার সহযোগীরা শুভকে হত্যার হুমকি দিচ্ছিল বলে এজাহারে বলেন তার মা।
এজাহারে বলা হয়, শুভ আগে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র মেরামতের কাজ করলেও পরে এলাকার কিছু বখাটে যুবকের সঙ্গে মাদক সেবনে আসক্ত হয়ে পড়েন। অপরাধ কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়েছিলেন।
এই মামলার পর পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করতে পারলেও শুভর সন্ধান দিতে পারেনি।
এর মধ্যে তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে ৩০ মার্চ উদ্ধার হওয়া রূপগঞ্জের অজ্ঞাত মরদেহের ছবি দেখালে রোববার পরিবারের লোকজন তা শুভর বলে শনাক্ত করে।
যদিও সাখাওয়াত ইসলাম রানার দাবি, এই ঘটনার সঙ্গে তিনি জড়িত নন।
“আমাকে মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানো হয়েছে। বরং আমি পুলিশকে আহ্বান করবো- সুষ্ঠু তদন্ত করুন। সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে।”
দুই পৃথক ঘটনায় রাজনৈতিক সংগঠনের শীর্ষ ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠায় নারায়ণগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও দলীয় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ অস্বীকার করলেও একের পর এক সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ ও প্রাণহানির ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।