
মোঃ মামুন হোসেন : দলীয় আনুগত্য নয়; যোগ্যতার ভিত্তিতে দেশপ্রেমিক ও উপযুক্ত ব্যক্তিদেরকে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একটি দেশের উন্নয়ন, সুশাসন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের পেছনে যাঁরা নীতিনির্ধারণী ও বাস্তবায়নকারী পদে থাকেন, তাঁদের দক্ষতা, সততা ও দেশপ্রেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যদি এসব পদে নিয়োগ বা পদায়নের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয় এবং যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করা হয়, তবে তা রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। তাই দলীয় আনুগত্য নয়; বরং যোগ্যতার ভিত্তিতে দেশপ্রেমিক ও উপযুক্ত ব্যক্তিদের সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।প্রথমত, যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়ন সুশাসনের প্রধান শর্ত। দক্ষ, অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত ব্যক্তিরাই একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারেন। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে যদি অনভিজ্ঞ বা অযোগ্য ব্যক্তিকে কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বসানো হয়, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে, প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি হয় এবং জনগণের ভোগান্তি বৃদ্ধি পায়। বিপরীতে, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তি দায়িত্ব পেলে তিনি ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করেন।দ্বিতীয়ত, দলীয়করণের প্রবণতা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নষ্ট করে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসন ও গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোকে নিরপেক্ষ ও পেশাদার হতে হয়। যখন কোনো পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রধান মানদণ্ড করা হয়, তখন প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের আস্থা হারায়। জনগণ মনে করে, সিদ্ধান্তগুলো ন্যায় ও যুক্তির ভিত্তিতে নয়, বরং দলীয় স্বার্থে নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা ও কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তৃতীয়ত, যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়ন তরুণ প্রজন্মের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। যদি তারা দেখে যে কঠোর পরিশ্রম, সততা ও মেধার মূল্যায়ন হচ্ছে, তবে তারা নিজেদের দক্ষতা উন্নয়নে উৎসাহী হবে। কিন্তু যদি তারা উপলব্ধি করে যে দলীয় পরিচয় ছাড়া উচ্চপদে যাওয়া সম্ভব নয়, তবে তাদের মাঝে হতাশা জন্ম নেয়। মেধা পাচার, অনুৎসাহ এবং নৈতিক অবক্ষয়ের মতো সমস্যা দেখা দেয়। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।
চতুর্থত, দেশপ্রেমিক ও নৈতিকতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন। তারা স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকেন। ব্যক্তিগত বা দলীয় লাভের পরিবর্তে তারা জাতীয় স্বার্থকে বড় করে দেখেন। এর ফলে দুর্নীতি কমে, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় থাকে এবং উন্নয়ন কার্যক্রম টেকসই হয়।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে যেসব দেশ যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলেছে, তারা দ্রুত উন্নতির পথে এগিয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মেধা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বই অগ্রগতির চাবিকাঠি। উন্নত বিশ্বে সরকারি নিয়োগ ও পদায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়, যাতে সেরা যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিরাই দায়িত্ব পান। আমাদের দেশেও যদি একই নীতি অনুসরণ করা হয়, তবে প্রশাসনিক দক্ষতা ও জনসেবার মান বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।তবে বাস্তবতা হলো, দলীয় আনুগত্যের সংস্কৃতি একদিনে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন শক্তিশালী নীতিমালা, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং কার্যকর জবাবদিহি ব্যবস্থা। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নিয়োগ কমিশন গঠন, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে পদোন্নতির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও দায়িত্ব রয়েছে—তারা যেন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখেন এবং যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেন। একটি দেশ তখনই প্রকৃত অর্থে এগিয়ে যায়, যখন তার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো সঠিক মানুষের হাতে ন্যস্ত থাকে। দলীয় আনুগত্য সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধা এনে দিতে পারে, কিন্তু তা কখনোই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না। যোগ্যতা, সততা, দেশপ্রেম ও নৈতিকতার ভিত্তিতে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন নিশ্চিত করা হলে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো শক্তিশালী হবে, জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং একটি বৈষম্যমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠনের পথ সুগম হবে। তাই সময় এসেছে দলীয়করণের সংকীর্ণতা পরিহার করে যোগ্যতার ভিত্তিতে দেশপ্রেমিক ও উপযুক্ত ব্যক্তিদের হাতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ